বাংলাদেশে কয়েক বছর ধরেই ব্যাংক আমানতের সুদের চেয়ে মূল্যস্ফীতি বেশি। ফলে ব্যাংকে টাকা রাখলেই লোকসান। ব্যাংকে টাকা রাখলে সুদ পাওয়া যায় ৪ শতাংশের সামান্য বেশি, অথচ সরকারি হিসাবেই মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশের কাছাকাছি, বেসরকারি হিসাবে আরও বেশি। তাই বছর শেষে প্রকৃত বিচারে আমানতকারীর কোনো লাভ নেই, বরং কর কর্তনের পর আরও এক ধাপ লোকসান! তাহলে করণীয় কী?

প্রথমেই বলি, দেশের আইনে যা অবৈধ, সেই পথে যাওয়া যাবে না। নিজের সঞ্চয় ব্যাংক থেকে তুলে তা দিয়ে বিদেশি মুদ্রা ডলার-ইউরো-পাউন্ড কিনবেন না দয়া করে। রাজনৈতিক দুর্বৃত্তরা ব্যাংকঋণ মেরে, প্রকল্প ব্যয় হাতিয়ে, চাঁদাবাজি, ঘুষ ও তদবিরের কালোটাকা ডলার বানিয়ে পাচার করেই ক্ষান্ত হয়নি, বরং কাঁচা টাকা দেশের ভেতরেও ফরেক্স ব্যবসায় লগ্নি করে ডলার-সংকটকে গভীর করেছে। অবাক হই, সাধারণ লোকে যখন প্রশ্ন করে, ডলার কিনে রাখব? অথচ বাংলাদেশ দ্বৈত মুদ্রা বৈধ করেনি।

তবে যাঁরা ফ্রিল্যান্সার এবং বৈধভাবে ডলারে আয় করেন, তাঁরা বৈদেশিক মুদ্রা উৎসে রেখে দিতে পারেন, সবচেয়ে ভালো হয় দেশের ব্যাংকে বৈদেশিক মুদ্রার হিসাব খুলে সেখানে রাখা, এটা বৈধ। ডলার ভাঙালে তা রিজার্ভে জমা হয়, না ভাঙালে বাণিজ্যিক ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে থাকে এবং এলসি নিষ্পত্তিতে কাজে লাগে। দুটোই দেশের জন্য দরকারি। অর্থাৎ শুধু ফ্রিল্যান্সার, রপ্তানিকারক এবং ডলারে সরাসরি আয়কারী আইনত বৈধ অপশনের সুবিধা নেবেন; কারণ, টাকার ক্রয়ক্ষমতা কমছে বলে ডলার সুরক্ষা ব্যক্তি ও দেশের উভয়ের জন্যই ভালো।

তা হলে কী করবেন? সবার আগে বিবেচনায় আনুন, আপনার কষ্টার্জিত বৈধ অর্থ কোন ব্যাংকে রেখেছেন। সেই ব্যাংকের পারফরম্যান্স কেমন? বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকের র‍্যাঙ্কিং করে মাঝেমধ্যে। ঝুঁকি মনে করলে আপনার টাকা খারাপ ব্যাংকে, দুর্বৃত্ত মালিকানা থাকা ব্যাংকে, চতুর্থ-পঞ্চম প্রজন্ম কিংবা রাজনৈতিক বিবেচনায় দেওয়া, মালিকানা হাতিয়ে নেওয়া কিংবা বাজে ব্যবসায়ী গ্রুপের মালিকানাধীন ব্যাংকে না রাখাই ভালো।

২০১৮ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৯টি ব্যাংক মূলধনও খেয়ে ফেলেছে। ৩০ জুন ২০১৯ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ক্যামেলস রেটিং প্রতিবেদনমতে, ১০টি ব্যাংক খারাপ অবস্থায় ছিল। ৯টি ব্যাংকের অবস্থা ‘মোটামুটি ভালো’, বাকি ৩৮টি ব্যাংকের অবস্থা ‘সন্তোষজনক’ ছিল। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিচারে দেশে ‘শক্তিশালী’ মানের কোনো ব্যাংক ছিল না। ক্যামেলস রেটিং হচ্ছে ব্যাংকের সামগ্রিক স্বাস্থ্য পরিমাপের মানদণ্ড। এখানে ব্যাংকের মূলধন পর্যাপ্ততা, সম্পদের মান, ব্যবস্থাপনা, উপার্জনক্ষমতা, তারল্যপ্রবাহ, বাজারঝুঁকির প্রতি সংবেদনশীলতা বিবেচনা করা হয়।
ব্যাংকে রক্ষিত অর্থ নিয়ে ব্যক্তিগতভাবে কেউ শঙ্কিত থাকলে খারাপ অবস্থায় থাকা ব্যাংকগুলো পরিত্যাগ করে সন্তোষজনক অবস্থায় থাকা ভালো ব্যাংকে টাকা রাখা ভালো। তবে সরকারি ব্যাংক খারাপ করলেও সেখানে জনগণের কর-ভ্যাটের পাবলিক মানি বেলআউট করা হয় বলে দিন শেষে টিকে থাকে। কিন্তু কোনোভাবেই নগদ টাকা হাতে রাখা ভালো নয়, এটা ঝুঁকিপূর্ণ। আর্থিক মন্দায় অপ্রয়োজনীয় খরচ হতে বিকল্প ভালো নয় এবং দেশের অর্থনীতির জন্যও সুখকর নয়।

প্রশ্ন আসে, সঞ্চয়পত্র কি নিরাপদ? বাংলাদেশে বেসরকারি খাতে পেনশন নেই। সরকারি খাতে যে পেনশন আছে, তার সঙ্গে জীবন চালানোর জন্য দরকারি খরচের কোনো সম্পর্ক নেই। ফলে অনেকেই সঞ্চয়পত্র কিনে রেখে সংসারের খরচ চালান।

ব্যাংকে টাকা রাখলে তা কমে যাচ্ছে ঠিক। তা সবারই কমছে, তাই আতঙ্কিত হওয়া যাবে না। একটা জাতীয় সংকট যদি তৈরি হয়, তা হলে তা থেকে ব্যক্তির পালানোর পথ আসলে কম। ‘শেয়ারড ডেসটিনি’ ভোগ করা অবধারিত। এ জন্য দেশে যাতে ‘সংকট’ না আসে, সময় থাকতেই সম্মিলিতভাবে সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিসরে কাজ করতে হয়।

সরকারের রাজস্ব আয়ের চেয়ে ঘোষিত বাজেট প্রায় দ্বিগুণ বড় বলে ঘাটতি মেটাতে তিন উৎস থেকে অর্থ ঋণ করে থাকে সরকার। প্রথমত, সঞ্চয়পত্র বিক্রি; দ্বিতীয়ত, ব্যাংকঋণ; তৃতীয়ত, বিদেশি ঋণ। অতিরিক্ত ঋণ করতে করতে সরকার তিন উৎসেরই অপব্যবহার করেছে। বাড়ন্ত বেকারত্বের কারণে, করোনাজনিত স্বাস্থ্য ব্যয় ও দারিদ্র্য বৃদ্ধির পর, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর খাদ্য ও জ্বালানিমূল্য বাড়ায়, দ্রব্যমূল্যের ব্যাপক ঊর্ধ্বগতিতে, অসহনীয় মূল্যস্ফীতিতে, বিদ্যুৎ-জ্বালানিসংকটে কারখানায় ছাঁটাইয়ে কাজ হারিয়ে মানুষ সঞ্চয় ভেঙে চলছেন। এ অবস্থায় সরকারের সঞ্চয়পত্র বিক্রি কমেছে এবং সরকারের সুদাসল পেমেন্ট বেড়েছে। বাকি ছিল অভ্যন্তরীণ ব্যাংকঋণ। তারল্য সংকট থাকায় এবং পুরোনো ঋণের দেনা বেশি হওয়ায় বেসরকারি ব্যাংক সরকারকে ঋণ দিতে চায় না। সাধারণ সুদহারের চেয়ে সরকারের ট্রেজারি বিল বা বন্ডের সুদহার কম হওয়ায় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো ট্রেজারি বিল-বন্ড কেনায় আগ্রহ হারিয়েছে।

নিয়মবহির্ভূতভাবে সরকারের ট্রেজারি বিল-বন্ড কিনে নিচ্ছে স্বয়ং বাংলাদেশ ব্যাংক, এতে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ কমেছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে ঋণ বাড়ছে। অর্থাৎ সরকার বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ ছাপাচ্ছে, এতে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়ছে।

এ অবস্থায় অর্থনীতিতে ব্যাপক পরিসরের কোনো আতঙ্ক তৈরি হলে, দলে দলে লোকে সঞ্চয়পত্র ভাঙতে শুরু করলে, সঞ্চয়পত্র ঋণের কয়েক লাখ কোটি টাকার ঋণের সুদাসল সরকার তাৎক্ষণিক ফেরত দিতে পারবে না, এমন অনুমান করার যথেষ্ট কারণ আছে।

তাহলে অন্য বিকল্প কী? অন্য বিকল্প হচ্ছে বিনিয়োগ। তবে মন্দায় কিংবা জ্বালানিসংকটে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত কঠিন। তথাপি ছোট ব্যবসায়, কৃষিতে, কৃষির উপখাতে কিংবা এসএমই খাতে নিরাপদ বিনিয়োগ ভালো। বাংলাদেশে আর্থিক অপরাধের বিস্তৃতি ও পাওনা না দেওয়ার সমস্যা প্রকট বলে পার্টনার বা বন্ধুদের সঙ্গে যৌথ ব্যবসার ব্যাপারে সতর্ক থাকা চাই। তথাপি বিশ্বস্ত পার্টনারের সঙ্গে বিনিয়োগ একটা ভালো পথ।

বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ অনিশ্চিত। সামনে যেকোনো রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার সুযোগে দুর্বৃত্তরা নতুন কোনো কেলেঙ্কারি ঘটানোর চেষ্টা চালাতে পারে। জমি-ফ্ল্যাট ক্রয় বিকল্প হতে পারে। কিন্তু উচ্চবিত্ত ও উচ্চমধ্যবিত্ত ছাড়া সাধারণ মানুষ জমি-ফ্ল্যাট কিনতে পারেন না। মূল্যস্ফীতিতে আতঙ্কিত মধ্যবিত্ত মানুষ এসব চিন্তা করতে পারেন না। যাঁদের সঞ্চয় মাঝারি বা বড়, তাঁদের জন্য এটা ভালো বিকল্প।

সম্প্রতি ক্রিপ্টোতে ঝুঁকেছিলেন অনেকেই। ক্রিপ্টো ঝুঁকিপূর্ণ এবং বাংলাদেশে অবৈধ। ক্রিপ্টোতে ঝুঁকে পড়া লোকেরা আবার ফরেক্স ব্যবসা করেন। এলসি নিষ্পত্তির সংকটে পড়ে, ডলারের রিজার্ভ কমায়, খোলাবাজারের ডলারসংকট থাকায় ডলারের বিপরীতে টাকার মান পড়ার মুখে আছে বলে ফরেক্স ব্যবসা লাভজনক মনে হতে পারে, কিন্তু এটা দেশের আইনপরিপন্থী।

অন্যদিকে সোনা কেনা নিরাপদ হতে পারে, কিন্তু সোনার দামও আকাশচুম্বী। সোনার বিভিন্ন গ্রামের বার কিংবা গয়না নিরাপদ বিনিয়োগ। কিন্তু সঞ্চয়ের বিপরীতে মাসে মাসে কিছু অর্থ পেয়ে মাসিক বাজার খরচ যাঁরা চালান, তাঁদের জন্য এটা বিকল্প নয়। স্বল্প মেয়াদে সোনা বিনিয়োগের সমস্যা হচ্ছে, বিক্রিতে একটা শতাংশ লোকসান হয়। অন্য দেশে গোল্ড ক্যারেট কোড ঠিক থাকলে বিক্রিতে লোকসান হয় না। নতুন কেনায় মেকিং চার্জ নিলেও বাংলাদেশে গোল্ড রিসেলে ভ্যালু ১০ থেকে ১৫ শতাংশ কম দেওয়া হয়।

সচ্ছলদের জন্য অলস টাকার সামাজিক ও কল্যাণমূলক বিনিয়োগ ভালো। আর্থিক রিটার্ন আসবে না, কিন্তু ব্যক্তি ও তাঁর কল্যাণকাজের, প্রতিষ্ঠানের সুনাম তৈরি হবে। পাশাপাশি দানের চর্চাও গড়তে হবে আমাদের, সংকটে আত্মীয়-প্রতিবেশীদের দান করা চাই। মহান সৃষ্টিকর্তা দানকারীদের খুব পছন্দ করেন।

ব্যাংকে টাকা রাখলে তা কমে যাচ্ছে ঠিক। তা সবারই কমছে, তাই আতঙ্কিত হওয়া যাবে না। একটা জাতীয় সংকট যদি তৈরি হয়, তা হলে তা থেকে ব্যক্তির পালানোর পথ আসলে কম। ‘শেয়ারড ডেসটিনি’ ভোগ করা অবধারিত। এ জন্য দেশে যাতে ‘সংকট’ না আসে, সময় থাকতেই সম্মিলিতভাবে সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিসরে কাজ করতে হয়। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের পথে সম্পৃক্ত থাকতে হয়। সর্বদা নিজের সম্পদের সুরক্ষা ও ব্যক্তিসুখের চিন্তা না করে, ভবিষ্যতের ভালোর জন্য রাজনৈতিক-অর্থনৈতিকভাবে সচেতন থাকা, অর্থাৎ ‘পলিটি’ হয়ে ওঠা জরুরি।

  • ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব টেকসই উন্নয়নবিষয়ক লেখক। গ্রন্থকার: চতুর্থ শিল্পবিপ্লব ও বাংলাদেশ; বাংলাদেশ: অর্থনীতির ৫০ বছর; অপ্রতিরোধ্য উন্নয়নের অভাবিত কথামালা; বাংলাদেশের পানি, পরিবেশ ও বর্জ্য। [email protected]