হজের শিক্ষা ও হজ–পরবর্তী জীবন 

পবিত্র হজফাইল ছবি: এএফপি

হজের সৌভাগ্য সবার হয় না। যাঁরা হজ করেন, তাঁরাও সবাই তা সঠিকভাবে সম্পন্ন করতে পারেন না। হজ করলেও অনেকে হজের শিক্ষা দেশে নিয়ে আসতে পারেন না। আবার হজ করে আসার পরও অনেকে সারা জীবনে হজের শিক্ষা ধারণ, লালন ও পালন করতে পারেন না।

হজ মূলত মানবতার প্রশিক্ষণ। পৃথিবীর সব মানুষ একই পিতা–মাতার সন্তান। মানুষে মানুষে কোনো ধরনের ভেদাভেদ নেই; সাদা-কালোয় কোনো প্রভেদ নেই। বর্ণবৈষম্য ও বংশকৌলীন্য মানুষেরই কৃত্রিম সৃষ্টি। পদ-পদবি ও অবস্থানগত পার্থক্যের কারণে মানুষের মধ্যে যে অদৃশ্য দেয়াল তৈরি হয়, হজের মাধ্যমে তা দূরীভূত হয়। 

জিলহজ মাসের ৭ তারিখে সব হাজি মিনার তাঁবুতে গিয়ে গণবিছানায় শুয়ে একাত্মতার ঘোষণা দেন। জিলহজের ৯ তারিখে হাজিরা আরাফাতের ময়দানে গিয়ে ঐক্যের অনন্য দৃষ্টান্ত তৈরি করেন; যেন এটি এক আন্তর্জাতিক মহাসম্মেলন। সেদিন সন্ধ্যায় (১০ জিলহজের রাতে) হাজিরা মুজদালিফায় গিয়ে সব কৃত্রিমতার অবসান ঘটিয়ে মানবতার পূর্ণতা এবং মানুষের আদি, আসল রূপ প্রকাশ করেন।

সবার পায়ের নিচে মাটি, মাথার ওপরে উন্মুক্ত আকাশ; সবার পরনে একই ইহরামের কাপড়। পোশাকে কোনো বাহুল্য নেই; মাথায় পাগড়ি-টুপি বা বাহারি চুলের আড়ম্বর নেই; সঙ্গে সেবক-কর্মচারী নেই। গন্তব্য এক হলেও পথ জানা নেই; নিজের শক্তি-সামর্থ্য বা জ্ঞানগরিমার প্রকাশ নেই; বুদ্ধি-বিবেচনা বা কৌশল প্রয়োগের সুযোগ নেই—শুধুই আল্লাহর ওপর ভরসা। এটিই মানবতার পূর্ণতা, এটিই হজের প্রকৃত উদ্দেশ্য ও আসল শিক্ষা। 

যাঁরা হজের শিক্ষা লাভে ধন্য হন, তাঁরাই প্রকৃত হাজি—যাঁরা হজকে জীবন পরিবর্তনের এক অপূর্ব সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেন এবং হজ-পরবর্তী জীবনে সেই শিক্ষা ধারণ করে জীবন পরিচালনা করেন। এ ধরনের হাজির সংখ্যা বাড়লে দেশ ও জাতির মঙ্গল সাধিত হবে, জনমানুষের কল্যাণ হবে। অন্যথায় তা হবে অর্থের অপচয়, সময়ের অপচয়, শক্তি-সামর্থ্যের অপব্যবহার এবং নফসের গোলামি বা আত্মপূজারই বহিঃপ্রকাশ। 

হজ একটি ফরজ ইবাদত; এটি কোনো সার্টিফিকেট কোর্স নয় এবং কোনো পদ-পদবি বা উপাধিও নয়। হজ করার পর নিজে থেকেই নামের সঙ্গে ‘হাজি’ বিশেষণ যোগ করা সমীচীন নয়। 

শারীরিক, আর্থিক ও আধ্যাত্মিক—এই তিনের সমন্বয়ে গঠিত ইবাদত হলো হজ। হজে রয়েছে সামাজিক ও আধ্যাত্মিক শিক্ষা, যা জীবনব্যাপী প্রতিফলিত হয়। আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘সুবিদিত মাসসমূহে হজব্রত সম্পাদিত হয়। অতঃপর যে কেউ এই মাসগুলোতে হজ করে, তার জন্য অশ্লীলতা, কুৎসা, অন্যায় আচরণ, ঝগড়া ও কলহ-বিবাদ বিধেয় নয়।’ (সুরা-২ বাকারা; আয়াত: ১৯৭)

হজে প্রতীকীভাবে শয়তানকে পাথর মারা হয়। কোরআন কারিমের সর্বশেষ সুরার সর্বশেষ আয়াতে দুই প্রকার শয়তানের কথা উল্লেখ আছে, ‘এরা হলো জিন শয়তান ও মানুষ শয়তান।’ (সুরা-১১৪ নাস, আয়াত: ৬) এ ছাড়া রয়েছে নফসের শয়তান (সুরা-১২ ইউসুফ, আয়াত: ৫৩)। এই তিন ধরনের শয়তানের প্ররোচনা ও তাড়না থেকে নিজেকে রক্ষা করা, মনোজগতে শয়তানি শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হওয়া এবং সব ধরনের শয়তানি ভাব ও প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে একমাত্র বিবেকের অনুসরণে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের ইবাদত তথা আনুগত্য করাই শয়তানকে পাথর মারার মূল তাৎপর্য। 

শয়তানকে পাথর মারার পর আরও বেশি সতর্ক থাকতে হবে, যাতে শয়তান আবার সক্রিয় হয়ে মানুষকে বিপথগামী করতে না পারে। আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয় শয়তান মানুষের প্রকাশ্য শত্রু।’ (সুরা-১২ ইউসুফ, আয়াত: ৫)। ‘শয়তান তোমাদের শত্রু; সুতরাং তোমরাও তাকে শত্রুরূপে গ্রহণ করো।’ (সুরা-৩৫ ফাতির, আয়াত: ৬) 

হজের শিক্ষা আমাদের আজীবন লালন ও ধারণ করতে হবে। সর্বদা তর্ক-বিতর্ক ও ঝগড়া-বিবাদ পরিহার করতে হবে। সব সময় অজুর সঙ্গে থাকার চেষ্টা করতে হবে এবং মনে সর্বদা আল্লাহর স্মরণ রাখতে হবে। নিজের স্বার্থ উদ্ধারের মানসিকতা পরিহার করতে হবে; নিজের আগে অন্যকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

অধ্যক্ষ মুফতি মাওলানা শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী 

সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতি; সহকারী অধ্যাপক, আহ্ছানিয়া ইনস্টিটিউট অব সুফিজম

[email protected]