default-image

যুক্তরাষ্ট্রের সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে দেশটির ভোটাররা ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী জো বাইডেনকে বিজয়ী নির্বাচিত করেছেন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প যদিও পরাজয় স্বীকার করেননি এবং ভোটের ফলাফলের বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ের প্রস্তুতি শুরু করেছেন, তবু অতি অস্বাভাবিক কিছু না ঘটলে, আগামী ১০ সপ্তাহ পর তাঁকে হোয়াইট হাউস ত্যাগ করতে হবে এবং জো বাইডেন যুক্তরাষ্ট্রের ৪৬তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করবেন। আমরা বাংলাদেশের জনসাধারণের পক্ষ থেকে মিস্টার জো বাইডেনকে অভিনন্দন জানাচ্ছি।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরাজয়ে স্বস্তির প্রকাশ লক্ষ করা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে চার বছরের দায়িত্ব পালনকালে তাঁর সরকার ঘরে ও বাইরে এমন কিছু নীতি অনুসরণ করেছে, যা গণতন্ত্র, উদারপন্থা ও বহুত্ববাদের আদর্শের পক্ষে ক্ষতিকর। বহু জাতি, ধর্ম, বর্ণের সমন্বয়ে গঠিত মার্কিন সমাজে শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদের সংকীর্ণ রাজনীতি প্রসারের প্রচেষ্টা সমাজটিকে বিভক্ত করেছে। মার্কিন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অনেক বনিয়াদি রীতিনীতি তাঁর আমলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

আন্তর্জাতিক পরিসরে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন রোধের লক্ষ্যে জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরে যাওয়ার সিদ্ধান্তটি বিশ্বজুড়ে ব্যাপক সমালোচিত হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধের লক্ষ্যে বহু বছরের বহুপক্ষীয় প্রচেষ্টার ফল ইরানের সঙ্গে জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন, যা ইরান ‘নিউক্লিয়ার ডিল’ নামে পরিচিত, ট্রাম্প প্রশাসন তা থেকেও যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নিয়েছে। আর আগ্রাসী সম্প্রসারণবাদী ইসরায়েলের প্রতি বাড়তি পক্ষপাত প্রদর্শনের অংশ হিসেবে সে দেশের মার্কিন দূতাবাস তেল আবিব থেকে জেরুজালেমে স্থানান্তর করেছে, যার ফলে আরব বিশ্বে ব্যাপক নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া হয়েছে। বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক অঙ্গনে চীনের সঙ্গে ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের অবনতি এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য প্রতিকূল পরিবেশ সৃষ্টির কারণ হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

ট্রাম্পের বিরুদ্ধে বিজয়ী জো বাইডেন বলেছেন, ‘দিস ইজ দ্য টাইম টু হিল আমেরিকা’—তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের চার বছরের শাসনামলে সামগ্রিক অর্থে যুক্তরাষ্ট্রের যে ক্ষতি হয়েছে, সেই ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার সময় এখন তাঁর সামনে এসেছে। আমরা বলব, শুধু আমেরিকান রাষ্ট্র ও সমাজের অভ্যন্তরে নয়, জো বাইডেনের নেতৃত্বে নতুন মার্কিন সরকার আন্তর্জাতিক অঙ্গনের ক্ষতগুলোও সারানোর উদ্যোগ নেবে। বাইডেনের প্রতি বিশ্বনেতাদের অভিনন্দনবার্তার সঙ্গে আশাবাদও ব্যক্ত হচ্ছে। যেমন ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি আশা প্রকাশ করেছেন, জো বাইডেনের নেতৃত্বে নতুন মার্কিন প্রশাসন ট্রাম্প প্রশাসনের ভুল সিদ্ধান্তগুলো শুধরে নেবে। আন্তর্জাতিক রাজনীতির পর্যবেক্ষক ও বিশ্লেষকদের অনেকে আশা করছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের আমলে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতার ফলে ক্রমবর্ধমান সামরিকায়নের গতি বাইডেন প্রশাসনের আমলে হ্রাস পেতে পারে। কেননা, জো বাইডেন অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিষয়গুলোর ওপরই বেশি গুরুত্ব দেবেন। আমরাও আশা করি, যুদ্ধ-সংঘাত ও সামরিকায়নের পেছনে অর্থ ব্যয়ের পরিবর্তে অর্থনৈতিক সহযোগিতার মাধ্যমে বিশ্বের সব দেশের জনগণের জীবনমানের উন্নয়নের প্রতিই বেশি গুরুত্ব আরোপ করা হবে।

যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও বড় উন্নয়ন সহযোগী। দুই দেশের সম্পর্ক আগাগোড়াই প্রীতিপূর্ণ ও সহযোগিতামূলক। আমরা আশা করব, প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের আমলে এই সম্পর্ক দৃঢ়তর হবে। যুক্তরাষ্ট্রের এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক নীতি-অবস্থানের বড় কোনো পরিবর্তন ঘটুক বা না ঘটুক, দ্বিপক্ষীয় পর্যায়ে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের আরও উন্নয়ন সাধনের জন্য আমাদের তরফেও প্রয়াস জোরদার করতে হবে। অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক-সহযোগিতা বৃদ্ধির পাশাপাশি মানবাধিকার, নির্বাচনও গণতন্ত্রসহ অন্য যেসব বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকে, আমাদের সেই সব ক্ষেত্রেও দৃষ্টি দিতে হবে।

মন্তব্য পড়ুন 0