বিশেষ কোনো সমাজ বা রাষ্ট্রের দিকে ইঙ্গিত না করে নোবেল বিজয়ী অমর্ত্য সেন গণতন্ত্র প্রসঙ্গে তিনটি কথা বলেছেন। প্রথমত, গণতন্ত্র সমুন্নত রাখতে হলে ব্যক্তিস্বাধীনতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, গণতন্ত্র কতটা উৎকর্ষ লাভ করল, সেই বিতের্ক না গিয়েও এর বিকাশের প্রতিই নজর দেওয়া জরুরি। তৃতীয়ত, গণতন্ত্রে আলোচনা ছাড়া কিছু সম্ভব নয়। এর মধ্য দিয়ে তাঁর কোনো নতুন দৃষ্টিভঙ্গির নয়, গণতন্ত্র ও উন্নয়ন সম্পর্কে তাঁর এত দিনকার সুচিন্তিত অভিমত পুনর্ব্যক্ত হয়েছে।
তবে সোমবার ‘অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও মানবিক প্রগতি’ বক্তৃতায় তাঁর যেসব কথা আমাদের সমকালীন রাজনীতিতে বিবেচনার দাবি রাখে, তা হলো মানবিক প্রগতি ও অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার মধ্যে একটি দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক রয়েছে। তাই বলে কেবল প্রগতি বা উন্নয়ন দেখিয়ে মানবিক প্রগতিকে দুর্বল করা গ্রহণযোগ্য হবে না। আগে গণতন্ত্র, না উন্নয়ন—এই কূট তর্ক থেকে অমর্ত্য দর্শনের দূরত্ব যোজন যোজন।
অর্থনীতির সঙ্গে দরকার মানবিক প্রগতিওঅমর্ত্য সেন আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে গণতন্ত্রের বহুমাত্রিকতা রয়েছে। এটা কেবল নির্বাচিত হওয়া বা ভোটযজ্ঞনির্ভর ব্যবস্থা নয়। আমাদের দেশে গণতন্ত্রের রাজনৈতিক দিকটি যত বেশি দৈনন্দিন জীবনের আলোচনায়
জেঁকে বসে, ততটাই কিন্তু অমর্ত্য নির্দেশিত জবাবদিহি, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় মানুষের অংশগ্রহণের বিষয়টি উপেক্ষিত থাকে। অথচ এসব ছাড়া বহুপক্ষীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা দিয়েও গণতন্ত্র হবে না। আলাপ-আলোচনা ও জবাবদিহি থেকে শুরু করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য খাতের মতো সামাজিক বিনিয়োগ বাড়ানোর সঙ্গে অর্থনৈতিক উন্নয়নের যেমন, তেমনি গণতন্ত্রের উন্নয়নের সম্পর্ক রয়েছে।
নোবেল বিজয়ী এই অর্থনীতিবিদ শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতার অপরিহার্যতার ওপর জোর দিয়ে নারীর ক্ষমতায়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবাসহ বিভিন্ন সামাজিক সূচকে বাংলাদেশের অর্জনের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। এ অর্জন ধরে রাখার জন্যও যে উন্নয়নের মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি ও বহুমাত্রিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সংহত করার বিকল্প নেই, সে কথাটিও তিনি আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।

বিজ্ঞাপন
সম্পাদকীয় থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন