আবার বাসে নারী ধর্ষণ

সম্পাদকীয়

নারায়ণগঞ্জে চলন্ত বাসে আবারও নারী ধর্ষণের ঘটনা ঘটল। প্রথম আলোর খবর থেকে জানা যায়, গত রোববার রাত ১০টার দিকে গাউছিয়ায় যাওয়ার জন্য যাত্রাবাড়ী থেকে মুক্তিযোদ্ধা পরিবহনের একটি বাসে ওঠেন এক গৃহবধূ। চিটাগাং রোড বাসস্ট্যান্ডে গেলে বাসের যাত্রীরা নেমে যান। এ সময় বাসে একা ছিলেন ওই গৃহবধূ। বাসচালক কাঁচপুর দিয়ে ভুলতা-গাউছিয়া রুটে না গিয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ধরে চলতে থাকেন। মদনপুর জাহিন টেক্সটাইল মিলসংলগ্ন এলাকায় পৌঁছালে সুপারভাইজার ও সহকারী বাসের দরজা-জানালা লাগিয়ে উচ্চ শব্দে গান ছেড়ে দেন এবং চালক, সুপারভাইজার ও সহকারী গৃহবধূকে ধর্ষণ করেন।

একপর্যায়ে ওই গৃহবধূ প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়ার কথা বলে নিচে নেমে যান এবং আড়ালে গিয়ে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে কল দিয়ে বিষয়টি পুলিশকে জানান। রাতেই অভিযান চালিয়ে গৃহবধূকে উদ্ধার ও অপরাধীদের গ্রেপ্তার করে। বাসচালক রিমান্ডে আছেন এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় বাসের সুপারভাইজার ও সহকারীকে গাজীপুরের কিশোর অপরাধ সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে।

বাংলাদেশে বাসে প্রায়ই নারী ধর্ষণ ও নিগ্রহের ঘটনা ঘটলেও এর বিরুদ্ধে তেমন সামাজিক প্রতিরোধ বা আন্দোলন দেখা যাচ্ছে না। অথচ ২০১২ সালের ১৬ ডিসেম্বর দিল্লিতে ফিজিওথেরাপির ছাত্রী নির্ভয়াকে (ছদ্মনাম) চলন্ত বাসে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় ভারতজুড়ে প্রতিবাদ হয়েছিল। ফলে সেখানে গণপরিবহনে অপরাধের সংখ্যাও অনেক কমেছে। গেল শতকের নব্বই দশকে দিনাজপুর পৌঁছে দেওয়ার নাম করে এক দল পুলিশ কর্তৃক ইয়াসমিন নামের এক কিশোরী ধর্ষণের শিকার হলে বাংলাদেশে সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলন গড়ে ওঠে। অপরাধীরা শাস্তিও পান। পরবর্তীকালে গণপরিবহনে নারী নিগ্রহের ঘটনায় তেমন প্রতিবাদ লক্ষ করা যায়নি। ব্যতিক্রম ছিল ২০১৭ সালে রূপা ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা। এ ঘটনায়ও চার অপরাধী শাস্তি পেয়েছেন। বাস্তবতা হলো যে ঘটনা নিয়ে জোরালো প্রতিবাদ হয়, সেই ঘটনার বিচার হয়, অপরাধীরা শাস্তি পায়।

ব্যক্তিগত পরিবহনে অপরাধ ঘটলে তার দায় সেই পরিবহনের মালিক ও শ্রমিক উভয়কে নিতে হয়। গণপরিবহনের ক্ষেত্রেও তা হওয়া উচিত। মালিকেরা যখন সরকারের ছাড়পত্র নিয়ে সড়কে গণপরিবহন নামান, তখন তাঁদের কিছু শর্ত পূরণ করতে হয়। বিশেষ করে যাত্রীদের নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়া। এর ব্যত্যয় ঘটলে পরিবহনকর্মীর সঙ্গে মালিককেও দায়িত্ব নিতে হবে। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গণপরিবহনকর্মীদের মধ্যে ৩০ শতাংশ মাদকাসক্ত। তাঁদের হাতে পরিবহন বা যাত্রী—কেউ নিরাপদ নন।

নারায়ণগঞ্জে যে পরিবহনের বাসে গৃহবধূ ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে, তার মালিককেও আইন ও জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি। কারণ, পরিবহন প্রতিষ্ঠানগুলোর দায় রয়েছে কর্মীদের নিয়োগ দেওয়ার আগে তাঁদের জীবনবৃত্তান্ত পরখ করা ও যথাযথ খোঁজখবর নেওয়ার। যাঁদের নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে তঁারা যাত্রীদের নিরাপত্তা রক্ষা করতে পারবেন কি না, সেটা নিশ্চিত করা মালিকের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। পরিবহনমালিক ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনা গেলে চালক ও শ্রমিক নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতার বিষয়টি অনেকটাই নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

কেবল গণপরিবহনে নয়, ঘরে-বাইরে সবখানেই নারীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন এবং হত্যা-ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন। এর হাত থেকে নারীদের রক্ষার জন্য আইনের কঠোর প্রয়োগ যেমন জরুরি, তেমনি অপরাধীদের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধও আবশ্যক। সম্প্রতি ভারতের এক কিশোরী তার সুইসাইড নোটে লিখে গেছে, গোর ও মাতৃগর্ভ ছাড়া কোথাও নারী নিরাপদ নন। এ ভয়ানক ঘটনাগুলো যদি জেগে ওঠার সংকেত হিসেবে কাজ না করে, তবে সামনে আরও বিপদ আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে।