করোনাকালে স্বাস্থ্য খাত

ভারতসহ অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের হার কম। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, সেই বরাদ্দও ব্যবহার করতে পরছে না সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও প্রতিষ্ঠান। কেন্দ্র থেকে তৃণমূল প্রায় একই চিত্র। শনিবার প্রথম আলোর প্রধান শিরোনাম ছিল, ‘বরাদ্দের টাকা ফেরত যাচ্ছে।’

খবরে বলা হয়, করোনা রোগীদের ব্যবস্থাপনার সুবিধার্থে গত বছর দেশের প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে তিন লাখ টাকা বরাদ্দ দেয় সরকার। এ টাকা করোনা রোগীদের চিকিৎসা প্রস্তুতি, সরঞ্জাম ক্রয়সহ বেশ কিছু খাতে খরচ করার কথা। কিন্তু অনেক উপজেলায় একটি টাকাও খরচ করা হয়নি। ফলে টাকা ফেরত গেছে। কিছু উপজেলায় আংশিক খরচ করা হয়েছে। উপজেলাগুলোতে চলতি বছরও তিন লাখ টাকা করে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এই অর্থ বরাদ্দ করার উদ্দেশ্য ছিল করোনা আক্রান্ত রোগীদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা। সেখানে অবকাঠামো, লোকবল ও চিকিৎসাসামগ্রীর ঘাটতি থাকলে তা পূরণ করে স্বাস্থ্যসেবার দক্ষতা বাড়ানো। বরাদ্দ ফেরত যাওয়ায় দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের কোনো সমস্যা না হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন চিকিৎসাসেবাপ্রার্থীরা। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১১টি জেলার ৪৫টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মধ্যে ১১টি বরাদ্দের এক টাকাও খরচ করতে পারেনি। আংশিক টাকা খরচ হয়েছে ১০টিতে এবং পুরো টাকা খরচ হয়েছে ২১টিতে।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অবস্থা বেহাল থাকলে কী ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়, তা হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করা গেল চলমান করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে। প্রথম ঢেউয়ের সময় বড় বড় শহরগুলোতেই বেশি সংক্রমিত করেছে। দ্বিতীয় ঢেউয়ে সীমান্তবর্তী জেলা-উপজেলাগুলোর মানুষ বেশি আক্রান্ত হয়েছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জন্য বরাদ্দ ব্যবহার না হওয়ার কারণ সেখানে আর্থিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা। অনেক উপজেলায় পদাধিকারীদের অর্থ ব্যয় করার অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা নেই। এ ছাড়া বরাদ্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে যেসব নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, করোনাসংকটের সময় তা প্রতিপালন করাও কঠিন। এ কারণে অনেক উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ঝামেলায় না গিয়ে টাকা ফেরত পাঠিয়েছে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে বরাদ্দের টাকা পেতেও দেরি হয়েছে। পৌষের গীত বর্ষায় কাজে লাগে না। কিন্তু তাঁরা একবারও ভেবে দেখলেন না, করোনার উপসর্গ দেখা দিলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ প্রথমে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেই যান। রোগীর শারীরিক অবস্থা গুরুতর না হলে সেখানেই চিকিৎসা সম্ভব। আবার দূরের জেলা সদরে গিয়ে চিকিৎসা করানোর সামর্থ্যও অনেকের নেই। বাস্তবতা হলো পরীক্ষা ও চিকিৎসার প্রয়োজনীয় সামগ্রী নেই অজুহাত দেখিয়ে অধিকাংশ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স রোগীকে সরাসরি জেলা হাসপাতালে পাঠিয়ে দিয়েছে, এখনো দিচ্ছে।

যেসব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স অর্থ ফেরত দিয়েছে বা পুরো খরচ করতে পারেনি, সেসব প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। সমস্যাটি কোথায়, চিহ্নিত করে প্রতিকারের ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে বিশেষজ্ঞরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে আর্থিক ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়াতে হবে। প্রশিক্ষণ ও নিয়মিত তদারকির মাধ্যমেই তা সম্ভব। অন্যথায় প্রতিবছর বাজেটে বরাদ্দ হতে থাকবে এবং মেয়াদ শেষে অর্থ ফেরত যাবে; যা ভঙ্গুর স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনাকে আরও দুর্বল ও রুগ্ণ করবে। বরাদ্দ ফেরত দেওয়া নয়, যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করুন।