বিজ্ঞাপন

প্রতিবছর বাজেট তৈরির সময় কালোটাকা সাদা করা না করার বিষয়টি আলোচনায় আসে। অর্থনীতিবিদ থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষ কালোটাকা সাদা না করার পক্ষে কথা বলেন। এমনকি জাতীয় সংসদের বেশির ভাগ জনপ্রতিনিধিও তাঁদের সঙ্গে একমত পোষণ করেন। কিন্তু যখন বাজেট পাস হয়, তখন দেখা যায় কালোটাকা সাদা করার বিধান যথারীতি বহাল থাকে। চলতি বছরও অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে প্রাক্‌-বাজেট আলোচনায় ব্যবসায়ী নেতারা কালোটাকা সাদা না করার পক্ষে জোরালো যুক্তি তুলে ধরেছেন। কিন্তু অর্থমন্ত্রী তাঁদের বক্তব্য আমলে নেননি, তাঁর সর্বশেষ বক্তব্যই তার প্রমাণ।

কালোটাকা সাদা করার মাধ্যমে সেই সব নাগরিককে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়, যাঁরা সম্পদের হিসাব ঠিকমতো দেন না এবং আয়কর ফাঁকি দেন। অন্যদিকে যেসব নাগরিক সরকারের আইন মেনে ঠিকঠাকমতো কর দেন, তাঁদের প্রতি অবিচার করা হয়। বাংলাদেশের আয়কর আইনানুযায়ী আয়ের সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ পর্যন্ত কর দিতে হয়। কিন্তু যাঁরা কর ফাঁকি দিলেন, তাঁরা ১০ শতাংশ হারে জরিমানা দিয়ে কালোটাকা সাদা করে নিতে পারবেন।

গত বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেছিলেন, অন্য আইনে যা-ই থাকুক না কেন, ১০ শতাংশ কর দিয়ে অপ্রদর্শিত জমি, বিল্ডিং, ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্টের প্রতি বর্গমিটারের ওপর নির্দিষ্ট হারে এবং নগদ অর্থ, ব্যাংকে গচ্ছিত অর্থ, সঞ্চয়পত্র, শেয়ার, বন্ড বা অন্য কোনো সিকিউরিটিজের ওপর ১০ শতাংশ কর প্রদান করে আয়কর রিটার্নে দেখালে অন্য কোনো কর্তৃপক্ষ তা নিয়ে প্রশ্ন করতে পারবে না। এর মাধ্যমে অর্থমন্ত্রী হয়তো এই ইঙ্গিত দিতে চাইছেন যে এর মাধ্যমে অপ্রদর্শিত অর্থ জাতীয় অর্থনীতিকে পুষ্ট করবে, বিনিয়োগ বাড়বে। কিন্তু আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ সরকার কখনোই কর ফাঁকিবাজদের উৎসাহিত করতে পারে না। সরকারের উচিত সৎ করদাতাদের উৎসাহিত করার পাশাপাশি কালোটাকার উৎস বন্ধ করতে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া। এ ছাড়া করবিন্যাসে যেসব অসংগতি আছে, তা–ও অবিলম্বে সংশোধন করা জরুরি বলে মনে করি। অপ্রদর্শিত আয় কিংবা অবৈধ উপায়ে উপার্জন করে যদি কেউ ১০ শতাংশ জরিমানা দিয়ে রেহাই পেয়ে যান, কোনো কর্তৃপক্ষ তাঁকে প্রশ্ন করতে না পারে, তাহলে সৎ করদাতারা নিরুৎসাহিত হবেন।

চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে বাংলাদেশের জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বা এনবিআর বলছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে ১০ হাজার ২২০ কোটি টাকা অপ্রদর্শিত আয় প্রায় ৯৫০ কোটি টাকা কর দিয়ে বৈধ করেছেন ৭ হাজার ৪৪৫ জন করদাতা। এনবিআরের হিসাবে স্বাধীনতার পর থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে জরিমানা দিয়ে বৈধ করা মোট টাকার পরিমাণ প্রায় সাড়ে ১৮ হাজার কোটি টাকা।

এই পরিসংখ্যান অর্থমন্ত্রীকে যতই উৎসাহিত করুক না কেন, আয়কর ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ও ন্যায্যতা ফিরিয়ে আনতে শিষ্টের লালন ও দুষ্টের দমন করতেই হবে।

সম্পাদকীয় থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন