default-image

বৃহস্পতিবার প্রথম আলোয় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে ২০২০ সালে বাংলাদেশে মানুষের মৃত্যুর শীর্ষ ১০টি কারণ তুলে ধরা হয়েছে। দেখা যাচ্ছে, গত বছর সবচেয়ে বেশিসংখ্যক মানুষ মারা গেছেন হৃদ্‌রোগে। তাঁদের সংখ্যা ২ লাখ ২৩ হাজার ৬১২। দ্বিতীয় শীর্ষ কারণ মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ—৮৫ হাজার ৩৬০ জন। তৃতীয় শীর্ষ কারণ ক্যানসার। গত বছর ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ৮৩ হাজার ১৩৪ জন।

গত বছরের ৮ মার্চ এ দেশে প্রথম করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ার পর থেকে আমরা এ মহামারির মধ্যেই বাস করছি। হৃদ্‌রোগ, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ, ক্যানসার, শ্বাসতন্ত্রের রোগ, কিডনি রোগ ও ডায়াবেটিস—এ রোগগুলোর কারণে মানুষের মৃত্যু আগের বছরের তুলনায় নানা মাত্রায় বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি বেড়েছে কিডনি রোগে মৃত্যু (১৬৪ শতাংশ), তারপরই আছে মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণজনিত মৃত্যু (৮৮ শতাংশ)। ক্যানসারে মৃত্যুর হার বেড়েছে আগের বছরের তুলনায় ৩২ শতাংশ। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে এই কয়েকটি রোগে মৃত্যুর হার এমন উচ্চ মাত্রায় বেড়ে যাওয়ার পেছনে করোনাভাইরাসের প্রভাব কতটা রয়েছে, তা গভীর গবেষণার বিষয়।

বিজ্ঞাপন

তবে করোনাভাইরাসের প্রভাবের বাইরেই যে এসব রোগে বাংলাদেশে বিপুলসংখ্যক মানুষ প্রতিবছর মারা যাচ্ছেন, সেটাও আমাদের জাতীয় স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে একটি দুশ্চিন্তার বিষয়। এই প্রতিটি রোগের বিষয়েই ব্যাপক গবেষণা প্রয়োজন। কীভাবে এগুলোর প্রকোপ কমানো যায়, তাও নীতি–নির্ধারণ পর্যায়ে ভেবে দেখা উচিত।

আমাদের জাতীয় অর্থনীতির একটি বড় খাত কৃষি। এ খাতে কর্মরত মানুষের স্বাস্থ্য বিশেষ গুরুত্ব পায় না। কৃষি খাত ও গ্রামীণ অর্থনীতির অনেক উন্নতি হয়েছে, কিন্তু কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত মানুষের স্বাস্থ্য ও পুষ্টিগত পরিস্থিতি সে তুলনায় উন্নত হয়নি। জাতীয় গড় আয়ু বৃদ্ধির ক্ষেত্রে কৃষক ও কৃষিশ্রমিকেরা কী মাত্রায় অন্তর্ভুক্ত, তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন। দেখা যাচ্ছে, কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত মানুষের মধ্যে ক্যানসার, কিডনি, লিভার, শ্বাসযন্ত্র, স্নায়ুতন্ত্রের রোগ ইত্যাদি বাড়ছে। এসব রোগের সঙ্গে কৃষিকাজে রাসায়নিক কীটনাশক ও বালাইনাশক বিষ ব্যবহারের সম্পর্ক আছে বলে অনেক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় বলা হয়েছে। বিশেষত ক্যানসারের সঙ্গে রাসায়নিক কীটনাশকের সম্পর্ক নিবিড়। জাতীয় ক্যানসার ইনস্টিটিউটের এক গবেষণা সমীক্ষায় বলা হয়েছে, ২০১৫ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত তাদের হাসপাতালে ক্যানসার আক্রান্ত যত পুরুষ রোগী ভর্তি হয়েছিলেন, তাঁদের ৬৪ শতাংশই কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত। আকারে ছোট হলেও এ সমীক্ষা তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের অধিকাংশই পুরুষ এবং বাংলাদেশে কৃষিকাজে বিষাক্ত রাসায়নিক কীটনাশক–বালাইনাশকের ব্যবহার অনিয়ন্ত্রিত। এ বিষের সংস্পর্শে শুধু যে ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে তা–ই নয়; লিভার, কিডনি, স্নায়ুতন্ত্র, প্রজননস্বাস্থ্যও রাসায়নিক কীটনাশকের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে বাংলাদেশের কৃষিজীবীদের মধ্যে যাঁরা এসব রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন এবং কেউ কেউ মারা যাচ্ছেন, তাঁদের এসব রোগের পেছনে রাসায়নিক কীটনাশকের প্রভাব কতটা, সে সম্পর্কে সঠিক চিত্র পাওয়ার জন্য আরও ব্যাপক পরিসরে ও দীর্ঘ সময় ধরে গবেষণা–সমীক্ষা চালানো প্রয়োজন।

তবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইতিমধ্যে গবেষণা হয়েছে, তা থেকে রাসায়নিক কীটনাশকের সঙ্গে উল্লিখিত রোগগুলোর সম্পর্ক প্রমাণিত হয়েছে। এ বৈজ্ঞানিক তথ্য বিবেচনায় নিয়ে আমাদের কৃষি খাতে রাসায়নিক কীটনাশক ও বালাইনাশকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া একান্ত প্রয়োজন। জেলা–উপজেলা পর্যায়ে সরকারের কৃষি বিভাগের এদিকে দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন। বিশেষভাবে প্রয়োজন কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত লোকজনের মধ্যে সচেতনতা তৈরির উদ্যোগ। উপজেলা পর্যায়ে কৃষক ও কৃষিশ্রমিকদের সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ সভার নিয়মিত আয়োজন এ ক্ষেত্রে ফলদায়ী হতে পারে।

বিজ্ঞাপন
সম্পাদকীয় থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন