জনপ্রশাসনে নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি ও কর্মস্থল নির্ধারণ প্রশাসনিক শৃঙ্খলার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া যে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় এ নিয়মনীতির বড় ধরনের ব্যত্যয় ঘটে, সেখানে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করার প্রক্রিয়ায় বিঘ্ন ঘটাই স্বাভাবিক। কর্মস্থল নির্ধারণ সুশাসন প্রতিষ্ঠার মৌল নীতিগুলোর অন্যতম। আর এটা অনস্বীকার্য যে জনপ্রশাসনে কর্মস্থল নির্ধারণ যে একটি অত্যন্ত জনগুরুত্বসম্পন্ন বিষয়, সেটা তেমন করে আলোচনার পাদপ্রদীপে আসেনি। নিয়োগ-বাণিজ্য, বদলি, পদোন্নতি গণমাধ্যমে শিরোনামে এলেও কর্মস্থল নির্ধারণ আসেনি। বদলি ও কর্মস্থল নির্ধারণকে সমর্থক বিবেচনা করা হলেও অনেক ক্ষেত্রে তা এক নয়। এসব বিষয়ে যত দূর সম্ভব একটা লিখিত নীতিমালা অনুসরণ করা উচিত। নিয়োগের মতো এখানেও আর্থিক দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে।

প্রথম আলো প্রতিবেদনে বলেছে, কতিপয় মন্ত্রী-সাংসদ সাম্প্রতিক কালে অনানুষ্ঠানিক পত্রে (ডিও লেটার) চিকিৎসকদের বদলি ও কর্মস্থল নির্ধারণে সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন। এতে বিব্রত স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্বীকার করেছেন যে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা যদি এভাবে তদবির করেন, তাহলে ‘কাজের পরিধি’ খর্ব হয়। এখানে আরও একটি জরুরি প্রশ্ন হলো, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাজের পরিধি নৈতিকতাপূর্ণ কি না। তঁারা কি দেশের হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে নিয়মতান্ত্রিকভাবে বদলি ও পদোন্নতি নিশ্চিত করে চলছিলেন? কেবল ডিও লেটারের মাধ্যমে আসা তদবির বা অনুরোধ রক্ষা করতে গিয়েই কি তাঁরা নিয়মনীতির বরখেলাপ ঘটাতে বাধ্য হচ্ছেন?

বিজ্ঞাপন

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে চিকিৎসক এবং অন্য প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের নিয়োগ ও বদলিবিষয়ক বিস্তর অনিয়মের খবর গণমাধ্যমে আসছে। তবে কোনো সন্দেহ নেই, মন্ত্রী-সাংসদেরা যখন আনুষ্ঠানিকভাবে বদলির তদবির করেন, তখন তা নানা প্রশ্ন ও টানাপোড়েন তৈরি করে। সরকারপ্রধানের পরই মন্ত্রী-সাংসদদের স্থান। তাঁরা যদি বদলিসংক্রান্ত লিখিত অনুরোধ করে থাকেন সেটা মানতেই হবে, বিষয়টি তা নয়। এখানে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও কর্তৃপক্ষের বিচার-বিবেচনার বিষয়টিই আসল। জনপ্রশাসনে তদবিরে বদলির বিষয়টি শুধু চিকিৎসকদের মধ্যে সীমিত নয়। ওসি, এসপি, ইউএনও, ডিসিসহ যাঁরাই জনসেবা প্রদানের সঙ্গে বেশি জড়িত, তাঁরাই কমবেশি তদবির-রূঢ়তার শিকার। অনেক মন্ত্রী–সাংসদ ওসি, ইউএনওদের কে কোথায় নিয়োগ পাবেন বা থাকবেন কি থাকবেন না, সেটা নির্ধারণে প্রভাব বিস্তার করেন। বদলি-পদায়নে জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ততা নিষ্কলুষ নয়। সেখানে অন্য রকমের লেনদেনের ইঙ্গিত থাকতে পারে। এ অভিযোগের সত্যাসত্যের মাত্রা যা-ই হোক না কেন, ডিও লেটার দিয়ে তদবির অবশ্যই গ্রহণযোগ্য নয়।

বদলি ও কর্মস্থল নির্ধারণেও মেধা, দক্ষতা ও যোগ্যতার বিষয় অধিকতর তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারে। যেমন পুলিশ প্রশাসন বিশেষজ্ঞরা অনেক দিন ধরেই বলে আসছেন যে উপজেলা ও জেলাগুলোকে গুরুত্ব অনুযায়ী গ্রেডেশন করা উচিত। কারণ, প্রশাসনিক এলাকা, জনসংখ্যা, ভৌগোলিক অবস্থান ইত্যাদির দিক থেকে সব জায়গা সমান নয়। তাই যাঁরা অধিকতর চৌকস, তাঁদের চ্যালেঞ্জিং স্থানে কাজ করতে দেওয়ার যে সুযোগ, সেটা অবশ্যই নীতিমালা-সমর্থিত হতে হবে।

অপ্রিয় হলেও সত্য যে ঘুণে ধরা ঔপনিবেশিক প্রশাসনিক শাসনকাঠামো, যা আমরা পশ্চিম পাকিস্তানি অগণতান্ত্রিক শাসকগোষ্ঠীর কাছ থেকে পেয়েছি, সেখানে বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। বরং ভালো যেটুকু ছিল, সেখানেও ছেদ পড়েছে। প্রায় সব ধরনের সরকারি চাকরিতেই বদলি যে ‘তদবির’সর্বস্ব হয়ে উঠেছে, তার সঙ্গে প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতির সম্বন্ধ আছে। এটা কোনো লুকোছাপার বিষয় নয়।

আমরা আশা করব, পুলিশ বা চিকিৎসক—কোনো পেশাজীবীদের জন্যই তদবির কোনো ভালো বিকল্প নয়। এটা আরও অনিয়ম-দুর্নীতি ও বঞ্চনার জন্ম দেয়। অনেকে বলেন, পুলিশে নিয়োগ ও বদলিতে যদি ‘তদবির-দুর্নীতি’ রোধ করা সম্ভব হতো, তাহলে গোটা দেশের সুশাসনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা সম্ভব হতো। সুতরাং আমরা তদবিরকারী মন্ত্রী-সাংসদদের কাছে আবেদন করব, তাঁরা যাতে সুষ্ঠু নীতিবিধি তৈরি ও তা বাস্তবায়নে সচেষ্ট হন।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0