নারী-পুরুষের সমতা

২০১৮ সালের ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) বৈশ্বিক প্রতিবেদনে নারী-পুরুষের সমতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাফল্যের স্বীকৃতি মিলেছে। ১৪৯টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৪৮তম। এটি দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষে। বাংলাদেশের পরে রয়েছে শ্রীলঙ্কা, এর অবস্থান ১০০তম। নেপাল ১০৫, ভারত ১০৮, মালদ্বীপ ১১৩, ভুটান ১২২ ও পাকিস্তান ১৪৮তম অবস্থান পেয়েছে।  শীর্ষ পাঁচে রয়েছে আইসল্যান্ড, নরওয়ে, সুইডেন, ফিনল্যান্ড ও নিকারাগুয়া।

নারী-পুরুষের সমতার ক্ষেত্রে ডব্লিউইএফ যে বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে থাকে তার মধ্যে রয়েছে নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ ও সুযোগ, শিক্ষায় অংশগ্রহণ, স্বাস্থ্য ও আয়ু এবং রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন। সার্বিক বৈশ্বিক সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান যা-ই হোক না কেন, চারটি বিষয়ে শীর্ষে আছে যথাক্রমে ছেলে ও মেয়েশিশুদের বিদ্যালয়ে ভর্তি, মাধ্যমিকে ছেলে ও মেয়েদের সমতা এবং ছেলে ও মেয়েশিশুর সংখ্যাগত ভারসাম্য। এ ছাড়া নারী সরকারপ্রধান হিসেবে আড়াই দশকের বেশি দেশ পরিচালনার দ্বিতীয় উদাহরণ নেই। ১৯৯১ সাল থেকে মাঝখানে দুই বছর বাদে নারী প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ শাসন করেছেন। এটি ব্যতিক্রমী ঘটনাই বটে। এ ছাড়া বাংলাদেশে জাতীয় সংসদের স্পিকার, বিরোধী দলের নেতার আসনও অলংকৃত করেছেন নারী। ঊর্ধ্বতন সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তা, বিচারক পদে নারীর সংখ্যা বৃদ্ধিও ক্ষমতায়নের পথে অগ্রগতি হিসেবে বিবেচনা করা যায়। এই সাফল্যকে উদ্‌যাপন করতে পারি।

কিন্তু এত সব সাফল্য সত্ত্বেও অনেক ক্ষেত্রে আমরা পিছিয়ে আছি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, সরকারের শীর্ষ পদে নারী থাকলেও সংসদে তাঁদের প্রতিনিধিত্ব আশানুরূপ নয়। বৈশ্বিক সূচকে ৮০তম, যা সার্বিক সূচকের প্রায় অর্ধেক। দ্বিতীয়ত, শিক্ষায় নারী-পুরুষের সমতা দেখা গেলেও কর্মক্ষেত্রে রয়েছে বৈষম্য। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নারীরা এখনো অনেক পিছিয়ে আছেন। বাল্যবিবাহ, সামাজিক ও ধর্মীয় বিধিনিষেধের পাশাপাশি নিরাপত্তাহীনতার কারণেই এমনটি ঘটেছে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সহস্রাধিক প্রার্থীর মধ্যে নারী প্রার্থী এক শর কম। এটি কোনোভাবে সমতার লক্ষণ নয়।

বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়নের প্রশংসা করেছেন নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনও। তাঁর মতে, বাংলাদেশ নারী শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবায় ভারতকে ছাড়িয়ে গেছে। ভারত শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবাসহ অনেক ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের চেয়ে পিছিয়ে আছে, যদিও দেশটির অর্থনৈতিক অবস্থান বাংলাদেশের চেয়ে ভালো। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সেরা হওয়ার পর বাংলাদেশের লক্ষ্য এখন হওয়া উচিত উন্নত বিশ্বের মান বিবেচনায় নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা। বর্তমান সাফল্যকে আমরা নিশ্চয়ই উদ্‌যাপন করব, কিন্তু এই সাফল্য যেন আমাদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা জোগায়।