নিরাময় কেন্দ্রে অনিয়ম

মাদকের ভয়াবহ বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে যত্রতত্র মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র গড়ে উঠছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অনুমোদন না নিয়ে গড়ে ওঠা এসব তথাকথিত কেন্দ্র চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের নামে মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে নির্যাতন এবং পরিবারগুলোর সঙ্গে প্রতারণা করছে। নজরদারির বাইরে থাকা এসব নিরাময় কেন্দ্রে ইয়াবাসহ সব ধরনের মাদকের অবাধ ব্যবহার চলছে। দেখা যাচ্ছে, অনেক কেন্দ্র মাদকাসক্ত ব্যক্তিরাই গড়ে তুলছেন। ফলে স্বজনদের বিপুল অঙ্কের টাকা ব্যয় হওয়ার পরও কোনো লাভ হচ্ছে না।

প্রথম আলোর প্রতিবেদন জানাচ্ছে, গাজীপুর সিটি করপোরেশন ও উপজেলাগুলোতে প্রায় অর্ধশত মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র গড়ে উঠেছে। এগুলোর মধ্যে হাতে গোনা কিছু প্রতিষ্ঠানের সরকারি নিবন্ধন থাকলেও বেশির ভাগের অনুমোদন নেই।

২০০৫ সালের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের বিধিমালা অনুযায়ী প্রতিটি নিরাময় কেন্দ্রে সার্বক্ষণিক চিকিৎসক, মনোবিদ, নার্স, ওয়ার্ড বয় ও সুইপার থাকতে হয়। রোগীদের সরবরাহ করা খাবারের তালিকা, মানসিক বিনোদনের প্রয়োজনীয় উপকরণ ও ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের সুবিধা, প্রয়োজনীয় শৌচাগার, অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, প্যাথলজিক্যাল ল্যাবরেটরি এবং রোগীদের কাউন্সেলিংয়ের জন্য ক্লাসরুম থাকার বিধান রয়েছে।

কিন্তু বাস্তব চিত্র পুরোপুরি ভিন্ন। চিকিৎসার নামে শুধু রোগীদের আটকে রাখা হচ্ছে। শারীরিক চিকিৎসা ও মানসিক কাউন্সেলিংয়ের কোনো ব্যবস্থা নেই। অভিজ্ঞ চিকিৎসক, কর্মী ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজনীয় উপকরণ নেই। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে গাদাগাদি করে রোগী রাখা, নিম্নমানের খাবার দেওয়া, পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে না দেওয়া, মারধরসহ শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যার মতো দুর্ভাগ্যজনক ঘটনাও ঘটছে।

সম্প্রতি গাজীপুরের ভাওয়াল মাদকাসক্তি পুনর্বাসন কেন্দ্র থেকে চলচ্চিত্র অভিনেতা অনিক রহমানকে উদ্ধারের ঘটনায় দেশব্যাপী তোলপাড় হয়। ওই কেন্দ্রে নিয়মিত শারীরিক, মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন অনিক। তাঁর সম্পর্কে মিথ্যা তথ্য দিয়ে ভয় দেখিয়ে পরিবারের কাছ থেকে বড় অঙ্কের টাকাও আদায় করা হয়েছিল। র‍্যাবের হাতে ওই কেন্দ্রের পরিচালকেরা গ্রেপ্তার হওয়ার পর এসব তথ্য জনসমক্ষে আসে।

প্রশ্ন হচ্ছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর—সবার সামনেই অনুমোদনহীন নিরাময় কেন্দ্র চালু হয় কীভাবে? আবার অনুমোদিত কেন্দ্রগুলোতে ঠিকঠাক পরিবেশ ও ব্যবস্থাপনা থাকছে কি না, সেটা কেন তদারক করা যাচ্ছে না? নিবন্ধনহীন কেন্দ্রগুলো দ্রুত বন্ধ করতে হবে। নতুন কেন্দ্র অনুমোদনের আগেই সেগুলো সব শর্ত পূরণ করতে সক্ষম কি না, তা খতিয়ে দেখতে হবে। পরবর্তী সময়ে সেগুলো শর্ত ঠিকঠাক মেনে চলছে কি না, তা নিয়মিত তদারক করতে হবে।