অন্যদিকে জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) পরিচালিত এক গবেষণায় বলা হয়, বাংলাদেশে এখনো ২ কোটি ১০ লাখ মানুষ অর্থাৎ প্রতি আটজনের মধ্যে একজনের পুষ্টিকর খাবার জোগাড়ের ক্ষমতা নেই। অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস ও অসচেতনতার কারণেও প্রচুর মানুষ প্রয়োজনীয় পুষ্টি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এ কারণে ৩১ শতাংশ শিশুর শারীরিক বিকাশ ঠিকমতো হচ্ছে না।

স্বাস্থ্যকর খাবারের বিষয়টি এমন যে এর জন্য গবেষণার প্রয়োজন হয় না, ঘরে-বাইরে তাকালেই সেটি দেখা যায়। পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক নাজমা শাহীন প্রথম আলোকে বলেন, কিছু মানুষ সামর্থ্য না থাকার কারণে স্বাস্থ্যসম্মত খাবার কিনতে পারেন না। অনেকে খাদ্যের গুণাগুণ সম্পর্কেও জানেন না, তাই সামর্থ্য থাকলেও মানুষ ঠিক খাবার কেনেন না।

প্রথমোক্ত গবেষণায় মানুষ তিন মাত্রার অপুষ্টির ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে বলেছে, দেশের পাঁচ বছরের কম বয়সী ২৮ শতাংশ শিশুর উচ্চতা বয়সের তুলনায় কম ও ৮ শতাংশ শিশু কৃশ বা তীব্র অপুষ্টির শিকার। ৪০ শতাংশ নারী রক্তস্বল্পতায় ভুগছেন, অর্থাৎ তাঁরা অণুপুষ্টিকণার ঘাটতির শিকার। অন্যদিকে প্রাপ্তবয়স্ক ১৬ শতাংশ পুরুষ ও ১৮ শতাংশ নারীর ওজন বেশি। ওজন বেশি এমন নারী-পুরুষের মধ্যে স্থূলতা বাড়ছে।

বাংলাদেশের মানুষের খাদ্যতালিকায় বরাবর শস্য (চাল, গম), ডাল, সবজি (পাতাসহ সবজি ও পাতাবিহীন সবজি) অগ্রাধিকার পায়। অন্যদিকে ফল, মাংস-মাছ-ডিম, দুধ ও দুগ্ধজাত খাবারকে তাঁরা অগ্রাধিকারের তালিকায় রাখেন না। কেউ কেউ একে বাহুল্য হিসেবেও বিবেচনা করেন। পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর বা পুষ্টিকর খাবারের সঙ্গে আর্থিক সামর্থ্যের বিষয়টি জড়িত। ২০১৯ সালে দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ২০ দশমিক ৫ শতাংশ। কিন্তু করোনার সময় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সঙ্গে দারিদ্র্যের হারও বেড়ে গেছে। ফলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে।

গবেষণায় এলাকাভিত্তিক যেসব তথ্য উঠে এসেছে, তা-ও উদ্বেগজনক। খুলনা বিভাগের ৬৬ শতাংশ পরিবারের স্বাস্থ্যসম্মত খাবার কেনার সামর্থ্য নেই। সেই সামর্থ্য আছে মাত্র ৩৪ শতাংশ পরিবারের। তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থা চট্টগ্রাম বিভাগে। এই বিভাগের ৭৫ শতাংশ পরিবারের স্বাস্থ্যসম্মত খাবার কেনার সামর্থ্য আছে। ৬৪ জেলার মধ্যে সামর্থ্যের দিক দিয়ে দেশের সবচেয়ে ভালো অবস্থানে কক্সবাজার জেলা, আর সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি মেহেরপুরে। এই জেলার ৭৬ শতাংশ পরিবারের স্বাস্থ্যসম্মত খাবার কেনার সামর্থ্য নেই। সামর্থ্যের ফারাক আছে শহর ও গ্রামের মানুষের মধ্যেও।

খাদ্য মানুষের সবচেয়ে মৌলিক চাহিদা। আর সেই খাদ্য হতে হবে অবশ্যই পুষ্টিকর ও স্বাস্থ্যসম্মত। আমরা যদি ভবিষ্যতে স্বাস্থ্যবান একটি জাতি প্রত্যাশা করি, তাহলে প্রত্যেক নাগরিকের ন্যূনতম পুষ্টি নিশ্চিত করতে হবে। খাদ্য সংগ্রহের বিষয়ে শহর ও গ্রামের বৈষম্য, এলাকাভিত্তিক বৈষম্য অবশ্যই দূর করতে হবে। বর্তমান বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে সবার জন্য স্বাস্থ্যকর খাবার নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয় কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন জরুরি হয়ে পড়েছে।

সম্পাদকীয় থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন