বনভূমি বেদখল

গত সোমবার পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়–সংক্রান্ত স্থায়ী কমিটির বৈঠকে মন্ত্রণালয়টি জানিয়েছে, দেশের ২ লাখ ৮৭ হাজার ৪৫২ একর বনভূমি অবৈধ দখলদারদের হাতে চলে গেছে। এই অবৈধ দখলদারের সংখ্যা প্রায় ৯০ হাজার। তথ্যটি বিবেচনা করে দেখলে প্রতীয়মান হয়, বাংলাদেশের বনভূমি তদারকি ও সংরক্ষণ করার দায়িত্ব যে মন্ত্রণালয়ের, তাদের এদিকে যথাযথ দৃষ্টি ও মনোযোগ নেই। কারণ, এই বিপুল পরিমাণ বনভূমি রাতারাতি বেদখল হয়ে যায়নি; বছরের পর বছর ধরে এই বেআইনি ও পরিবেশ–ধ্বংসাত্মক তৎপরতা চলে এসেছে। বনভূমি বেদখল হয়ে যাওয়া যেমন উদ্বেগের বিষয়, এ বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব পালনে অবহেলা তেমনই দুর্ভাগ্যজনক।

বনভূমি বেদখল হয়ে যাওয়ার অর্থ শুধু এই নয় যে এভাবে রাষ্ট্রের সম্পত্তি ব্যক্তি–প্রতিষ্ঠানগুলোর দখলে চলে যাচ্ছে। এর অর্থ এটাও যে এইভাবে দেশের বনভূমি উজাড় হয়ে যাচ্ছে এবং তার ফলে প্রাকৃতিক পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে। জাতিসংঘের বেঁধে দেওয়া লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী প্রতিটি রাষ্ট্রে মোট আয়তনের ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকতে হবে। কিন্তু বাংলাদেশে বনভূমি উজাড় হতে হতে এখন ১৫ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে; অবশ্য এই হিসাব সরকারের বন অধিদপ্তরের। বেসরকারিভাবে ধারণা করা হয়, আমাদের দেশে এখন প্রকৃত বনভূমির পরিমাণ এর চেয়ে কম।

বনভূমি জবরদখল ও গাছপালা কেটে উজাড় করার প্রক্রিয়াটি চলছে নিরন্তরভাবে, বছরের পর বছর ধরে। ফরেস্ট ওয়াচ নামের এক আন্তর্জাতিক সংস্থার দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ২০০১ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে প্রায় ৩ লাখ ৭৮ হাজার একর বনভূমি উজাড় হয়ে গেছে। বিশেষ উদ্বেগের বিষয় হলো, বনভূমি উজাড় করার এই প্রবণতা কয়েক বছর ধরে ভীষণভাবে বেড়েছে। ফরেস্ট ওয়াচ বলছে, ২০১৪ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরেই উজাড় হয়েছে ২ লাখ ৩১ হাজার একর বনভূমি। অর্থাৎ ২০১৪ সালের আগপর্যন্ত ১৩ বছরে যে পরিমাণ বনভূমি উজাড় হয়েছে, তার প্রায় দ্বিগুণ উজাড় হয়েছে সর্বশেষ পাঁচ বছরে। ২০১৮ সালের পরের দুই বছরে হিসাব পাওয়া যায়নি; কিন্তু ধারণা করা যায়, ওই একই হারে বনভূমি উজাড় চলতে থাকলে দেশের বনভূমির পরিমাণ আরও অনেক কমে যাবে।

সংসদীয় কমিটির ওই বৈঠকের পর কমিটির সভাপতি সাবের হোসেন চৌধুরী সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘আমরা দেখতে চাই, কারা এসব বনভূমি দখল করে রেখেছে। একচুল জমিও আমরা বেদখলে রাখতে চাই না।’ কমিটি মন্ত্রণালয়ের কাছে ৯০ হাজার অবৈধ দখলদার ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের তালিকা চেয়েছে। সংবাদমাধ্যমকে বলা হয়েছে, ওই তালিকা জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে। আমরা উৎসাহের সঙ্গে তালিকাটি দেখার জন্য অপেক্ষা করব। সঙ্গে এ কথাও বলব যে দখলদারদের তালিকা প্রকাশ করে বনভূমি উজাড়ের প্রক্রিয়ায় কোনো পরিবর্তন আসবে না, যদি তাদের হাত থেকে বনভূমিগুলো পুনরুদ্ধার না করা হয়। আসল কাজটিই হচ্ছে বেদখল হয়ে যাওয়া বনভূমি পুনরুদ্ধার করে স্বাভাবিক প্রাকৃতিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা এবং সেগুলো যেন আবারও বেদখল হয়ে না যায়, তা নিশ্চিত করা।

সেটা করতে হলে বনভূমি তদারকির ব্যবস্থা আরও কার্যকর করতে হবে। অবৈধ দখলদারেরা সাধারণত স্থানীয়ভাবে ক্ষমতাবান হয়ে থাকে, বিশেষত রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে এমন ব্যক্তিরা এসব তৎপরতায় লিপ্ত হয় এবং তাদের ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগের ব্যবস্থা যথাযথভাবে কাজ করে না। তাই রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী অবৈধ দখলদারদের দমন করার দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। বন বিভাগের অসাধু অংশের সঙ্গে অবৈধ দখলদারদের যোগসাজশও ছিন্ন করতে হবে। আর অবিলম্বে বেদখলে থাকা বনভূমি পুনরুদ্ধারের জন্য কঠোর ও ব্যাপক অভিযান চালানো প্রয়োজন।