default-image

১৮ জানুয়ারি সকালে যে তরুণ দম্পতি মোটরসাইকেলে করে গন্তব্যে যাচ্ছিলেন, তাঁদের জীবনপ্রদীপ নিভে গেল বেপরোয়া বাসের নিচে চাপা পড়ে। সকাল সাড়ে সাতটার দিকে তাঁরা রাজধানীর বিমানবন্দর এলাকার পদ্মা অয়েল গেটের পাশে যখন এসে পৌঁছান, তখন আজমেরী গ্লোরী পরিবহনের একটি বাস এসে পেছন থেকে ধাক্কা দেয়। এরপরও হয়তো এই দম্পতি বেঁচে যেতেন, কিন্তু বাসটি তাঁদের ওপর দিয়ে চালিয়ে যাওয়ায় দক্ষিণখানের মোল্লারটেক এলাকার বাসিন্দা আকাশ ইকবাল ও তাঁর স্ত্রী মায়া হাজারিকাকে অকালেই জীবন দিতে হলো। এই মৃত্যুর জবাব কী?

প্রতিটি মৃত্যুই বেদনাদায়ক। কিন্তু সেদিনের সড়ক দুর্ঘটনা কেবল দুটি জীবনই কেড়ে নেয়নি, তাঁদের শিশুসন্তানকেও চিরতরে এতিম করে গেল। অ্যালবামে মা–বাবার সঙ্গে ফুটফুটে শিশুটির ছবি অনেককে কাঁদিয়েছে। একই দিন চুয়াডাঙ্গায়ও আরেক দম্পতি মারা গেছেন বাসের চাপায়।

প্রথম আলোর অনুসন্ধানে জানা যায়, সড়কে যত দুর্ঘটনা ঘটে, তার ৩৫ শতাংশই মোটরসাইকেলে। এর অর্থ এই নয়, সব মোটরসাইকেল আরোহী দুর্ঘটনা ঘটান। আইন মেনে সড়কে চলাচল করার পরও অনেক মোটরসাইকেল আরোহী দুর্ঘটনার শিকার হন। বিমানবন্দর সড়কের ঘটনায় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) বাসের চালক তসিকুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করেছে। যদিও বাসের কন্ডাক্টর ও হেলপার পলাতক।

বিজ্ঞাপন

তদন্তে বেরিয়ে আসছে, চালক তসিকুল ইসলামের বাস বা ভারী যানবাহনের লাইসেন্সই ছিল না। তাঁর লাইসেন্স হালকা পরিবহনের। তারপরও ১০ বছর ধরে তিনি বাস চালিয়ে আসছিলেন। ২০১৯ সালের মার্চে রাজধানীর বসুন্ধরার নদ্দায় আবরার আহমেদ চৌধুরী নামের এক বিশ্ববিদ্যালয়শিক্ষার্থীকে চাপা দেয়, সেই বাসের চালকেরও ভারী যান চালানোর লাইসেন্স ছিল না। ভারী যান চালানো ও হালকা যান চালানোর মধ্যে অনেক পার্থক্য। আমরা প্রায়ই দেখি, ঢাকা শহরের রাস্তায় যানবাহন আটকে পুলিশ কাগজপত্র পরীক্ষা করছে। জরিমানা ও মামলা করছে। তাহলে সেসব কি লোকদেখানো?

এভাবে আর কত প্রাণ ঝরবে সড়কে? এসব দুর্ঘটনার জন্য চালক-হেলপার নিঃসন্দেহে দায়ী। কিন্তু দায় এড়াতে পারে না নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা বিআরটিএ, ট্রাফিক পুলিশ, সংশ্লিষ্ট পরিবহনমালিক। আজমেরী গ্লোরী পরিবহনের মালিক হালকা লাইসেন্সধারী চালককে দিয়ে ভারী পরিবহন বা বাস রাস্তায় নামিয়ে মানুষকে দুর্ঘটনা ও মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছেন। আর নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা তা দেখেও না দেখার ভান করছে। এ কারণেই সড়কে নৈরাজ্য বেড়েছে।

করোনার কারণে সড়কে গত বছর যান চলাচল কম ছিল। তারপরও ৫ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাবে, চার বছরে (২০১৬-২০১৯) দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন ২৯ হাজার ৩১৫ জন। অপর এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, বর্তমানে দেশে নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা ৩৮ লাখের বেশি। অথচ লাইসেন্সধারী চালক আছেন প্রায় ২০ লাখ। অর্থাৎ ৪৭ শতাংশের বেশি গাড়ি চালানো হচ্ছে ‘ভুয়া’ চালক দিয়ে।

নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করেছেন। তাঁদের আন্দোলনের মুখে সরকার পরিবহন আইন সংশোধন করে শাস্তি বাড়াল। কিন্তু সড়কে মৃত্যুর মিছিল থামছেই না। অতএব, আইন করাই যথেষ্ট নয়, এর যথাযথ প্রয়োগও নিশ্চিত করতে হবে। পরিবহনমালিক ও চালকদের আইন মানতে বাধ্য করতে হবে।

সম্পাদকীয় থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন