default-image

কোভিড-১৯-এর প্রতিরোধক টিকা নিয়ে যখন স্বাস্থ্য ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা দৌড়ঝাঁপ করছেন, তখন প্রথম আলোর একটি খবর কৌতূহল সৃষ্টি করেছে। খবরটির শিরোনাম ‘টিকা উৎপাদনের সক্ষমতা বাংলাদেশেই ছিল’।

গত ৫০ বছরে স্বাস্থ্য খাতে আমাদের যেমন উল্লেখযোগ্য সাফল্য আছে, তেমনি ব্যর্থতার পাল্লাও কম ভারী নয়। সাফল্যের মধ্যে আছে বাংলাদেশের ওষুধশিল্প বেশ সমৃদ্ধ। দেশের চাহিদা মিটিয়ে অনেক দেশে আমরা ওষুধ রপ্তানি করছি। আর ব্যর্থতা হলো স্বাস্থ্য খাতের অনেক সফল প্রতিষ্ঠান ধ্বংসের কিনারে চলে এসেছে নীতিনির্ধারকদের অবহেলা, অনিয়ম, অদক্ষতা ও ভ্রান্ত নীতির কারণে। ১৯৫৪ সালে প্রতিষ্ঠিত জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ছয় ধরনের টিকা উৎপাদন করত, যার মধ্যে ছিল গুটিবসন্ত, কলেরা, টাইফয়েড, প্যারাটাইফয়েড ও জলাতঙ্ক রোগের টিকা। এর মধ্যে গুটিবসন্ত নির্মূল হওয়ায় এই টিকার উৎপাদন বন্ধ করা যৌক্তিক। কিন্তু অন্যান্য টিকার উৎপাদন কেন বন্ধ করা হলো? ১০ বছর আগেও জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট জলাতঙ্ক রোগের টিকা উৎপাদন করেছিল। এরপর সব ধরনের টিকা উৎপাদন বন্ধ করে দেওয়া হয় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ‘পরামর্শ’ক্রমে। সংস্থাটি যদি জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী কোনো পরামর্শ দেয়, তাহলে আমরা তা গ্রহণ করব কেন? আমরা যত দূর জানি, সেকেলে প্রযুক্তির স্থলে কারখানাগুলোয় আধুনিক প্রযুক্তি আনার তাগিদ দিয়েছিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। কিন্তু সরকারের নীতিনির্ধারকেরা মাথাব্যথার জন্য মাথা কেটে ফেলাকেই শ্রেয় মনে করেছেন। ২০০৬-২০০৭ সালে ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানী ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানী ও কর্মকর্তাদের যে বৈঠক হয়, তাতে সেরামের বিশেষজ্ঞরা বাংলাদেশে একটি আধুনিক টিকা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার রূপরেখা তৈরি করে দিয়েছিলেন। কিন্তু ওই পর্যন্তই। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্তাব্যক্তিদের টিকা উৎপাদনের চেয়ে আমদানিতেই বেশি আগ্রহ।

বিজ্ঞাপন

দেশে টিকা উৎপাদনের জন্য একটি উন্নত কারখানা যে খুব প্রয়োজন, করোনা সংকট তা আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। করোনার প্রাদুর্ভাবের পর উন্নত বিশ্বের পাশাপাশি অনেক উন্নয়নশীল দেশও করোনার টিকা উৎপাদনের উদ্যোগ নেয়। কিন্তু বাংলাদেশ সে পথে না গিয়ে টিকা সংগ্রহের জন্য ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট, তথা একটিমাত্র উৎসের ওপর নির্ভর করে। ওই ইনস্টিটিউটের সঙ্গে তিন কোটি ডোজ টিকা সরবরাহের চুক্তি হলেও এ পর্যন্ত ৭০ লাখ ডোজের বেশি পাওয়া যায়নি। যদিও প্রতি মাসে ৫০ লাখ ডোজ টিকা সরবরাহের কথা ছিল। এ প্রেক্ষাপটে সরকারের হুঁশ ফিরেছে এবং চীন, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন উৎস থেকে টিকা সংগ্রহের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। রাশিয়া শর্ত সাপেক্ষে বাংলাদেশকে টিকা উৎপাদনের প্রযুক্তি দিতে রাজি আছে।

চীন ও রাশিয়া থেকে বাংলাদেশ যদি টিকা পায়ও, তাতে মোট চাহিদার একাংশ পূরণ হবে মাত্র। সরকার বলেছে, জনসংখ্যার ৮০ শতাংশকে টিকা কর্মসূচির আওতায় আনা হবে। দেশের মোট জনসংখ্যা ১৭ কোটি হলে ৮০ শতাংশ হবে কমবেশি ১৩ কোটি। প্রতিজনকে দুই ডোজ টিকা দিলে মোট ২৬ কোটি ডোজ টিকার প্রয়োজন হবে, যা স্বল্প সময়ে বাইরের উৎস থেকে সংগ্রহ করা কঠিন। দেশে টিকা উৎপাদন করা হলে তার খরচ কম পড়বে। দেশের অনেক সাশ্রয় হবে। প্রয়োজনে বাংলাদেশও টিকা বিদেশে রপ্তানি করতে পারবে।

জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের হারানো ‘ঐতিহ্য’ ফিরিয়ে আনা হোক। করোনাসহ প্রয়োজনীয় সব টিকাই দেশে তৈরি হোক।

সম্পাদকীয় থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন