প্রতারিত ও নিঃস্ব হয়ে দেশে ফেরা ৮৩ জন হতভাগা শ্রমিককে জেলে পাঠানো হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ভিয়েতনামফেরত ৮১ জন ও কাতারফেরত ২ জন। অসহায় এই মানুষগুলোর বিরুদ্ধে অদ্ভুত সব অভিযোগ এনেছে পুলিশ। বলা হয়েছে, তাঁরা নাকি বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছেন। এর আগে কুয়েত, কাতার ও বাহরাইন থেকে আসা ২১৯ জনকে জেলে নেওয়ার সময় যেসব অভিযোগ আনা হয়েছিল, এবারের অভিযোগও প্রায় একই রকম।

এসব শ্রমিক ভাগ্যবদলের আশায় চার থেকে সাড়ে চার লাখ টাকা খরচ করে ভিয়েতনাম গিয়েছিলেন। সাগরপথে বা অন্য কোনো অবৈধ উপায়ে তাঁরা যাননি। প্রচলিত সব নিয়মকানুনই তাঁরা মেনেছেন, সরকারের জনশক্তি, প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থান ব্যুরো (বিএমইটি) তাঁদের ছাড়পত্র দিয়েছে। কিন্তু ভিয়েতনামে গিয়ে জানতে পারলেন, যে চাকরির আশ্বাসে সেখানে গিয়েছিলেন, তা ছিল ভুয়া। যে বেতনের প্রতিশ্রুতি তাঁদের দেওয়া হয়েছিল, তা পাওয়ার সুযোগ নেই। বরং সেখানে তাঁদের তুলে দেওয়া হয় দালালদের হাতে, এরপর নানা রকম হয়রানি।

বিদেশের মাটিতে প্রতারিত হয়ে এই ৮১ জনের মধ্যে ২৭ জন গিয়েছিলেন ভিয়েতনামে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসে। এটাই তাঁদের অভিযোগ জানানোর একমাত্র স্থান। কিন্তু ঢাকায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বললেন, তাঁরা নাকি ভিয়েতনাম দূতাবাস দখল করতে গিয়েছিলেন। মন্ত্রীর এমন মন্তব্য ভিয়েতনামফেরতদের বিরুদ্ধে এ ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার ব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের উৎসাহিত করে থাকতে পারে। এই শ্রমিকেরা গত ১৮ আগস্ট ভিয়েতনাম থেকে দেশে ফেরেন। এরপর তাঁদের ১৪ দিনের কোয়ারেন্টিনে নেওয়া হয়। সেখান থেকে পুলিশ হেফাজতে।

বিজ্ঞাপন

১ সেপ্টেম্বর আদালতে দেওয়া পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, কোয়ারেন্টিন সেন্টারে থাকাকালে বিদেশফেরত শ্রমিকেরা সরকার ও রাষ্ট্রবিরোধী কাজে জড়িত থাকার উদ্দেশ্যে সলাপরামর্শ করেছেন। ৫৪ ধারায় সন্দেহজনক গ্রেপ্তার করার কথা জানিয়ে বলা হয়, তাঁরা জামিনে মুক্তি পেলে পালিয়ে যেতে পারেন। তাই তাঁদের জেলখানায় রাখা দরকার। প্রয়োজনে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে।

এর আগে মধ্যপ্রাচ্য থেকে যাঁরা ফেরত এসেছিলেন, তাঁরা ছোটখাটো অপরাধে সেখানে সাজাপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। কিন্তু ভিয়েতনামের তাঁরা কেউ জেলে ছিলেন না। বরং নিজেরাই দূতাবাসে দালালদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিয়ে দেশে ফিরেছেন। এ ঘটনায় অনেক প্রশ্ন সামনে চলে আসে।

প্রথমত, তাঁদের বিরুদ্ধে দূতাবাস দখলের তদন্ত হয়েছে কি না এবং সেই অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে কি না। দ্বিতীয়ত, গত ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সহস্রাধিক বাংলাদেশি কাজের আশায় ভিয়েতনাম গেলেন, সরকার কেন তাঁদের অনুমতি দিল? বিএমইটি কেন ছাড়পত্র দিয়েছিল? তৃতীয়ত, যেসব রিক্রুটিং এজেন্সি তাঁদের পাঠাল কিংবা যেসব সরকারি কর্মকর্তা ছাড়পত্র দিলেন, তাঁদের বিচার কেন হবে না? চতুর্থত, ভিয়েতনামে ১০ বাংলাদেশির একটি দালাল চক্র গড়ে উঠেছে বলে সংবাদমাধ্যমে খবর এসেছে, যঁাদের সঙ্গে দূতাবাসের সুসম্পর্ক আছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এই দালাল বা দূতাবাসের কর্মকর্তাদের বিষয়ে কোনো তদন্ত হয়েছে কি না।

এসব প্রশ্নের জবাব মেলার পরই হতভাগা শ্রমিকদের শাস্তি দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু কোনোক্রমেই আগে তাঁদের শাস্তি প্রাপ্য নয়।

এভাবে কষ্ট করে, নিঃস্ব হয়ে বিদেশে যাওয়া শ্রমিকদের রেমিট্যান্সের টাকায় কিন্তু আমাদের অর্থনীতি সমৃদ্ধ হয়। কিন্তু তাঁদের আমরা কতটুকু সম্মান দেখাই? তাঁদের বিপদে আমরা কতটা পাশে দাঁড়াই। ভিয়েতনামসহ অন্যান্য দেশ থেকে প্রতারিত ও নিঃস্ব হয়ে ফিরে আসা শ্রমিকদের দিকে তাকালেই আমাদের সেই দৃষ্টিভঙ্গি ফুটে ওঠে।

ভিয়েতনামের পুরো ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত হোক। এখানে দালাল থেকে শুরু করে রিক্রুটিং এজেন্সি, বিএমইটি, ভিয়েতনাম দূতাবাস, বিমানবন্দর, পুলিশ—কার কী ভূমিকা, তা তদন্ত করে দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তি নিশ্চিত করা হোক।

সম্পাদকীয় থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন