নাটোরের নলডাঙ্গা থেকে রাজশাহীর বাগমারার তাহেরপুর পর্যন্ত বারনই নদে মাছের মড়ক লেগেছে। ছোট-বড় দেশি প্রজাতির অসংখ্য মাছ মরে ভেসে উঠছে। পানিতে দুর্গন্ধ। কোথাও কোথাও গ্যাসের বুদ্বুদ দেখা যাচ্ছে। নদে নামলে চুলকানি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় মানুষ। জেলেরা মাছ ধরতে যেতে ভয় পাচ্ছেন। অথচ এমন ভয়াবহ পরিস্থিতির কারণ জানতে এখনো কার্যকর পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু হয়নি। এটি উদ্বেগজনক এবং দায়িত্বহীনতার পরিচয়।
বারনই নদে মাছের মড়ক এবারই প্রথম নয়, ২০২২ সালেও একই ঘটনা ঘটেছিল। তখন মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলেছিলেন, নদে পাট জাগ দেওয়ার কারণে পানি দূষিত হয়ে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা কমে মাছ মারা গেছে। এবারও কয়েক দিনের বৃষ্টির পর পাট পচানোর বর্জ্য নদের পানিতে মিশে যাওয়ার আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন মৎস্য কর্মকর্তারা। পাশাপাশি রাজশাহী নগরীর বর্জ্য, শিল্পকারখানার রাসায়নিক বর্জ্য এবং তাহেরপুর এলাকার পোলট্রি খামারের বর্জ্য নদে মিশে থাকতে পারে বলে তাঁরা ধারণা করছেন।
অর্থাৎ বারনই নদের দূষণের উৎস সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ধারণা রয়েছে। পাট পচানোর বর্জ্য নদে যাচ্ছে। নগরীর বর্জ্য খাল-নালা হয়ে নদে পড়ছে। শিল্পকারখানার রাসায়নিক বর্জ্যও নদে মিশছে। বৃষ্টির সময় এই বর্জ্যের প্রবাহ আরও বাড়ছে। এসব দূষণে পানিতে অক্সিজেনের মাত্রা কমে মাছ মারা যেতে পারে। রাসায়নিক দূষণ সরাসরি জলজ প্রাণীর জন্যও বিপজ্জনক।
প্রশ্ন হলো, এসব বর্জ্য নদে পড়ছে কীভাবে? দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলো এত দিন কী করেছে? নদে কি বর্জ্য ফেলার জায়গা? শিল্পকারখানা ও নগর কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব কি শুধু বর্জ্য সরিয়ে ফেলা, তা নদে গিয়ে পড়লেও তাদের কিছু যায় আসে না? পাট জাগ দেওয়ার নামে নদ দূষিত করারও কোনো দায় নেই? এই প্রশ্নগুলোর জবাব প্রয়োজন।
দূষণকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণেই নদের দূষণ বন্ধ হচ্ছে না। শিল্পকারখানার রাসায়নিক বর্জ্য অপরিশোধিত অবস্থায় নদে ফেলা হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। নগরীর বর্জ্য যাতে খাল-নালা হয়ে নদে না পড়ে, তা নিশ্চিত করতে হবে। পাট জাগের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় পরিবেশসম্মত ব্যবস্থা চালু করতে হবে। পোলট্রি খামারগুলোকেও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে হবে।
সবচেয়ে আগে প্রয়োজন বৈজ্ঞানিকভাবে কারণ শনাক্ত করা। কোথা থেকে দূষিত বর্জ্য নদে ঢুকছে, তা চিহ্নিত করতে হবে। মৎস্য বিভাগের পরীক্ষার সরঞ্জাম নষ্ট থাকলে পরিবেশ অধিদপ্তর, সরকারি গবেষণাগার বা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নিতে হবে। পরীক্ষা করার সক্ষমতা নেই—এ অজুহাতে একটি নদের পরিবেশ বিপর্যয়কে উপেক্ষা করা যায় না।
এখনই বারনই নদের পানি ব্যবহারে মানুষকে সতর্ক করার পাশাপাশি মৃত মাছ সংগ্রহ ও নিরাপদে অপসারণের ব্যবস্থা করা দরকার। একই সঙ্গে দূষণের উৎস বন্ধ করতে হবে। শুধু মাছ মরে যাওয়ার পর নমুনা সংগ্রহ করে প্রতিবেদন তৈরি করলেই দায়িত্ব শেষ হবে না।