জাতীয় নির্বাচনের মাত্র কয়েক দিন আগে যেভাবে তড়িঘড়ি করে জাতীয় গণমাধ্যম ও সম্প্রচার কমিশনের অধ্যাদেশ প্রকাশ করা হয়েছে, এর প্রক্রিয়া ও উদ্দেশ্য নিয়েই বড় প্রশ্নের জন্ম দেয়। বাংলাদেশে স্বাধীন গণমাধ্যমের বিকাশের জন্য একটি স্বাধীন ও অভিন্ন গণমাধ্যম কমিশন করার দাবি দীর্ঘদিনের। এ প্রেক্ষাপটেই অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর গণমাধ্যম সংস্কারের উদ্দেশ্যে কমিশন গঠন করে। কমিশন প্রায় ১০ মাস আগে তাদের প্রতিবেদন জমা দিলেও কোনো সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়নি। তবে মেয়াদের একেবারে শেষ মুহূর্তে এসে সংস্কার কমিশনের সুপারিশ উপেক্ষা করে অভিন্ন গণমাধ্যম কমিশনের বদলে দুটি পৃথক কমিশন করার উদ্যোগ নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, অংশীজনদের প্রায় অন্ধকারে রেখেই এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা অংশগ্রহণমূলক ও গণতান্ত্রিক চর্চার পরিপন্থী।
প্রথম আলোর খবর জানাচ্ছে, তথ্য মন্ত্রণালয় গত সপ্তাহে জাতীয় গণমাধ্যম কমিশন অধ্যাদেশ ২০২৬ এবং জাতীয় সম্প্রচার কমিশন অধ্যাদেশ ২০২৬–এর পৃথক দুটি খসড়া ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে। মতামত দেওয়ার জন্য মাত্র তিন দিন সময় দেওয়া হয়। পর্যালোচনা করে সরকারের বাকি মেয়াদের মধ্যেই অধ্যাদেশ দুটি অনুমোদন করে যাওয়ার চেষ্টা করা হবে বলে তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান জানিয়েছেন।
সংবাদপত্র সম্পাদকদের সংগঠন সম্পাদক পরিষদ গণমাধ্যম ও সম্প্রচার কমিশনের খসড়া নিয়ে যে উদ্বেগ জানিয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারকে অবশ্যই তা আমলে নিতে হবে। জাতীয় নির্বাচনের অল্প কিছুদিন আগে এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশের খসড়া তড়িঘড়ি প্রকাশকে অনভিপ্রেত ও অযৌক্তিক বলে মনে করে সংগঠনটি। আমরা মনে করি, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, সাংবাদিকতার পেশাগত মান এবং সম্প্রচারব্যবস্থার ভবিষ্যতের সঙ্গে এই আইন প্রত্যক্ষভাবে সংশ্লিষ্ট। সে ক্ষেত্রে অংশীজনদের সঙ্গে যথাযথ আলোচনা, পর্যালোচনা ছাড়া এমন খসড়া প্রণয়ন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন সংবাদপত্র ও বার্তা সংস্থার জন্য বিদ্যমান প্রেস কাউন্সিল এবং সম্প্রচারমাধ্যম ও অনলাইন গণমাধ্যমের জন্য আগের প্রস্তাবিত সম্প্রচার কমিশনের সমন্বয়ে ‘বাংলাদেশ গণমাধ্যম কমিশন’ গঠনের সুপারিশ করেছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত কমিশনের সুপারিশ কেন মানা হলো না, সেই ব্যাখ্যাও এখানে পরিষ্কার নেই। গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সাবেক প্রধান জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক কামাল আহমেদ প্রশ্ন তুলেছেন, সরকার তার শেষ সময়ে এসে তড়িঘড়ি করে অনেকটা জোড়াতালি দিয়ে অধ্যাদেশ করতে যাচ্ছে, তাতে এর উদ্দেশ্য অর্জিত হবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ থেকে যায়।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, প্রস্তাবিত গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন ও সম্প্রচার কমিশনের খসড়ায় এমন বিধিবিধান রাখা হয়েছে, যা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সুরক্ষার বদলে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের স্পষ্ট আশঙ্কা জন্ম দেয়। বিগত সরকারের আমলে নানা নিবর্তনমূলক আইন ও মামলা, হামলা, নির্যাতন, ভীতি প্রদর্শনসহ নানা কর্তৃত্ববাদী চর্চার মধ্য দিয়ে সংবাদমাধ্যমকে রাষ্ট্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছিল। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান তলানিতে নেমে এসেছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে নানা গোষ্ঠী সংবাদমাধ্যমের কার্যালয় পুড়িয়ে দেওয়া থেকে শুরু করে নানা ধরনের সহিংস কর্মকাণ্ড করেছে। সংবাদমাধ্যমের বৈশ্বিক সূচকে বাংলাদেশের কিছুটা অগ্রগতি হলেও কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতার পরিবেশ তৈরি করা এখনো দূর–অস্ত। এই বাস্তবতায় অংশীজনদের উপেক্ষা করে অধ্যাদেশ প্রণয়ন করা হলে, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নতুন করে হুমকিতে পড়বে। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ভঙ্গুর গণতন্ত্রও আরও বড় সংকটে পড়বে।
আমরা মনে করি, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা–সংক্রান্ত অতিগুরুত্বপূর্ণ আইন নির্বাচিত সংসদ গঠনের পরই হওয়াটা যৌক্তিক। সাংবাদিক, সম্পাদক, গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে বিস্তৃত ও অর্থবহ আলোচনার মাধ্যমেই সেটা হতে হবে।