সম্প্রতি রাজধানীর রামপুরা সেতু থেকে কুড়িল মোড় পর্যন্ত সড়কবাতি স্থাপনের দরপত্রে যে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে, তাতে জনসেবার প্রশ্নটি আবারও সামনে এসেছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) বিরুদ্ধে এ অভিযোগ উঠেছে। ‘খাতিরের’ ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দিতে দরপত্রের শর্ত বদল, কারিগরি কমিটির অনুমোদন না নেওয়া এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের এ ঘটনা আবারও প্রমাণ করে যে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি এখনো অনেক দূর।
প্রথম আলোর প্রতিবেদন জানাচ্ছে, দরপত্র জমা দেওয়ার সময়সীমা শেষ হওয়ার মাত্র তিন দিন আগে শর্ত পরিবর্তন করা হয়েছে। এটি কোনো স্বাভাবিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার সুনির্দিষ্ট কারসাজি। ‘আন্তর্জাতিক মান’ বাদ দিয়ে শুধু ‘প্রতিষ্ঠিত সংস্থা’ থেকে সনদ চাওয়ার শর্তটিই যথেষ্ট সন্দেহজনক। এর চেয়ে গুরুতর বিষয় হলো সোর্স কোড সরবরাহের নতুন শর্ত যোগ করা, যা কোনো আন্তর্জাতিক কোম্পানি সাধারণত দেয় না। এ ধরনের শর্ত জুড়ে দেওয়া হয় কেবল সেসব প্রতিষ্ঠানের জন্য, যাদের সঙ্গে কোনো যোগসাজশ থাকে।
এই কারসাজির পেছনে মূল অভিযোগের তির ডিএনসিসির প্রকৌশল বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সাইফুল ইসলামের দিকে। তিনি যদিও অভিযোগ অস্বীকার করে বলছেন যে শর্ত পরিবর্তন না করলে খরচ বাড়ত, কিন্তু সরকারি ক্রয়বিশেষজ্ঞ ফারুক হোসেনের বক্তব্য তাঁর দাবিকে মিথ্যা প্রমাণ করে।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো নির্বাচিত প্রতিষ্ঠান মেসার্স জেএপি ট্রেডিংয়ের নানা ত্রুটিবিচ্যুতির পরও তাদের কাজ দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। তারা গুরুত্বপূর্ণ এলভিডি এবং আরওএইচএস সনদ জমা দেয়নি, যা পরিবেশ ও নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য। এমনকি তারা যে বাতি সরবরাহ করার প্রস্তাব দিয়েছে, তার দাম প্রাক্কলিত মূল্যের তুলনায় প্রায় পাঁচ গুণ কম, যা মান নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তোলে। এ ধরনের নিম্নমানের সরঞ্জাম দিয়ে জনসেবার কাজ কতটা পূরণ হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
এই পুরো প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক প্রভাবের বিষয়টিও সামনে এসেছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিকের সঙ্গে সাবেক একজন সংসদ সদস্যের আত্মীয়তার সম্পর্ক এবং অতীতেও প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়ায় কাজ বাগিয়ে নেওয়ার অভিযোগ আছে। পুলিশের সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের আত্মীয়দের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের নামও এ অভিযোগে উঠে এসেছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে মানুষের প্রত্যাশা ছিল, তারা দুর্নীতির এই চক্র ভেঙে দেবে। ডিএনসিসির প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজের আশ্বাসে কিছুটা আশার আলো দেখা গেলেও, এ ধরনের ঘটনা নিয়মিত চলতে থাকলে তা জনগণের আস্থাকে আরও দুর্বল করবে। এই সমস্যা সমাধানে কেবল দরপত্র বাতিলই যথেষ্ট নয়। যঁারা এই কারসাজির সঙ্গে জড়িত, তঁাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।