বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করুন

সম্পাদকীয়

দেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে যে বিনিয়োগে স্থবিরতা চলছে, তা এখন আর অস্বীকার করার সুযোগ নেই। উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, সুদহার বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ—সব মিলিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ কঠিন হয়ে উঠেছে। এর মধ্যে করনীতির অসামঞ্জস্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। করপোরেট করহার ধাপে ধাপে কমিয়ে ২৭ দশমিক ৫০ শতাংশে নামানো হলেও বাস্তবে মোট করভার এখনো ৪০ শতাংশের বেশি, যা বিনিয়োগবান্ধব নয়; বরং নিরুৎসাহিত করার মতো।

এ অবস্থায় সরকার যদি নতুন করে টার্নওভার বা লেনদেন কর বাড়ানোর পথে হাঁটে, তবে তা হবে পরিস্থিতিকে আরও সংকটময় করে তোলার শামিল। ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন, এতে মূলধনে টান পড়বে, মুনাফা কমবে এবং নতুন বিনিয়োগ আরও কমে যাবে। অর্থনীতির এই মৌলিক বাস্তবতা উপেক্ষা করে রাজস্ব বাড়ানোর চেষ্টা শেষ পর্যন্ত উল্টো ফলই বয়ে আনতে পারে। আমরা মনে করি, গত রোববার মেট্রো চেম্বার ও ইআরএফের য়ৌথ আয়োজনে ব্যবসায়ী নেতারা যে অভিমত তুলে ধরেছেন, তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

করের হার সহনীয় হলে স্বতঃস্ফূর্তভাবে কর প্রদান বাড়ে এবং দীর্ঘ মেয়াদে রাজস্বও বৃদ্ধি পায়। ভ্যাটের ক্ষেত্রেও একই যুক্তি প্রযোজ্য। বর্তমানে ১৫ শতাংশ ভ্যাট অনেক ক্ষেত্রেই ভোক্তা ও ব্যবসা—উভয়ের জন্যই চাপ সৃষ্টি করছে। উচ্চ হার দিয়ে সীমিত করদাতার ওপর চাপ সৃষ্টি করার বদলে, কম হার দিয়ে করের আওতা বৃদ্ধি অধিক কার্যকর।

করনীতির আরেকটি বড় সমস্যা হলো জটিলতা ও প্রশাসনিক দুর্বলতা। দেশে এক কোটি টিআইএনধারী থাকলেও অর্ধেকের কম মানুষ আয়কর রিটার্ন জমা দেন। এটি শুধু করভীতি নয়; বরং আস্থার সংকটেরও প্রতিফলন। কর প্রদানের প্রক্রিয়া সহজ করা, টিআইএন ও এনআইডি ডেটাবেজ একীভূত করা এবং নতুন করদাতাদের জন্য প্রতীকী ন্যূনতম কর চালু করার মতো উদ্যোগ এ ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

এ ছাড়া করকাঠামোর মধ্যে যে অসামঞ্জস্য রয়েছে, তা দূর করাও জরুরি। একদিকে করপোরেট কর কমানোর ঘোষণা দেওয়া হয়, অন্যদিকে নানা শর্ত ও পরোক্ষ করের কারণে ব্যবসায়ীরা প্রকৃত সুবিধা পান না। নগদ লেনদেনের কঠোর শর্ত, উচ্চ আমদানি শুল্ক, উৎসে কর—সব মিলিয়ে কার্যকর করভার অনেক বেড়ে যায়। ফলে ঘোষিত করহারের সঙ্গে বাস্তবতার ফারাক তৈরি হয়।

রপ্তানি খাতের দুরবস্থাও এই করনীতির প্রভাব থেকে মুক্ত নয়। টানা কয়েক মাস ধরে রপ্তানি কমছে, যা সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য উদ্বেগজনক। এ পরিস্থিতিতে উৎসে কর কমানো এবং কাঁচামালের ওপর শুল্ক হ্রাস করা জরুরি। অন্যথায় আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ আরও পিছিয়ে পড়বে। একই সঙ্গে সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকেও করনীতি পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন। যেমন স্যানিটারি ন্যাপকিনের মতো প্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর উচ্চ শুল্ক শুধু অর্থনৈতিক নয়, জনস্বাস্থ্য সমস্যাও সৃষ্টি করছে। এ ধরনের পণ্যে করছাড় বা হ্রাস সরাসরি মানুষের জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে।

সবশেষে করনীতি নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো আস্থা। করদাতারা তখনই স্বতঃস্ফূর্তভাবে কর দেবেন, যখন তাঁরা দেখবেন তাঁদের দেওয়া অর্থ যথাযথভাবে ব্যয় হচ্ছে। স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও মানসম্মত সরকারি ব্যয় নিশ্চিত করা না গেলে করের আওতা সম্প্রসারণ করা কঠিন। আসন্ন জাতীয় বাজেট তাই শুধু রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণের একটি উপলক্ষ হওয়া উচিত নয়; এটি হতে হবে বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধির রূপরেখা। শাস্তিমূলক নয়, সহায়ক করনীতি প্রণয়নই পারে অর্থনীতির স্থবিরতা কাটিয়ে নতুন গতি আনতে।