মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেলের প্রাপ্তি নিয়ে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তাতে এবারের গ্রীষ্ম মৌসুমে বিদ্যুতের লোডশেডিং করতে হবে, সেটা আগে থেকেই ধারণা করা গিয়েছিল। কিন্তু তাই বলে আগের ধারাবাহিকতায় লোডশেডিংয়ের খড়্গ কেন গ্রামের মানুষের ওপর নেমে আসবে।
প্রথম আলোর খবর জানাচ্ছে, গত কয়েক দিনের তাপপ্রবাহ ও গরমের তীব্রতা বাড়ায় চাহিদার বিপরীতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে দুই থেকে তিন হাজার মেগাওয়াট ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) আওতাধীন গ্রাহকদের দিনে ছয়–আট ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন অবস্থায় থাকতে হচ্ছে। এর ফলে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে গ্রামীণ জনজীবন ও অর্থনীতিতে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হচ্ছে, বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শস্য বোরো ধানের সেচ ব্যাহত হচ্ছে গ্রামে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকার কারণে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অবশ্য জানিয়েছেন, বিদ্যুৎবৈষম্য কমাতে ঢাকায় পরীক্ষামূলকভাবে ১৫০ মেগাওয়াট লোডশেডিং করা হবে। এই সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়েই বলতে হয়, বিদ্যুৎবৈষম্য কমাতে পদক্ষেপ হিসেবে এটা যথেষ্ট নয়।
গ্রামের মানুষের ঘাড়ে লোডশেডিংয়ের বড় বোঝা চাপিয়ে দেওয়ার যে নীতি চলে আসছে, তার পেছনে কী যুক্তি থাকতে পারে, সেটা মোটেই বোধগম্য নয়। দুঃখজনক হলেও সত্যি, লোডশেডিংয়ের এই বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা বছরের পর বছর ধরে চলে আসছে এবং বিদ্যুৎবৈষম্য স্থায়ী নীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।
তথ্য বলছে, ২০২৩ সালের ১৫ এপ্রিল সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল ২ হাজার ৫০৬ মেগাওয়াট, যার মধ্যে ২ হাজার ২২৯ মেগাওয়াটই ছিল আরইবির। ২০২৪ সালের ৪ এপ্রিল সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল ১ হাজার ৮৯০ মেগাওয়াট। যদিও আরইবির তথ্য বলছে, তাদের লোডশেডিং ছিল ২ হাজার ১১ মেগাওয়াট। এ বছরের ২০ এপ্রিল ১ হাজার ৮৪০ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে বলে জানিয়েছে পিজিসিবি। অথচ আরইবির তথ্য বলছে, শুধু তাদের লোডশেডিং ছিল ২ হাজার ৮৯৭ মেগাওয়াট। অন্যদিকে ঢাকার বিদ্যুৎ সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত ডেসকো ও ডিপিডিসি চাহিদা অনুযায়ী পুরো সরবরাহটা পেয়েছে।
এই তথ্যগুলো শুধু গ্রাম ও শহরের বিদ্যুৎবৈষম্যের চিত্রকেই সামনে আনে না, লোডশেডিংয়ের প্রকৃত চিত্রও যে আড়াল করা হয়, সেই বাস্তবতাও সামনে আনে। প্রশ্ন হচ্ছে, বছরের পর বছর ধরে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) কেন এমন বৈষম্যমূলক ও অস্বচ্ছ চর্চা অব্যাহত রেখেছে। আমরা মনে করি, এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টিভঙ্গিই মূলত দায়ী। তাঁরা হয়তো মনে করেন, শহরে লোডশেডিং করলে তার যে প্রভাব, গ্রামে করলে সেটা অনেক কম পড়ে। সে ক্ষেত্রে শিল্প ও কৃষি উৎপাদনকে অগ্রাধিকার দিয়ে সমতাভিত্তিক লোডশেডিংই শহর ও গ্রাম দুই অংশের নাগরিকদের জন্য সহনীয় ও যৌক্তিক হতে পারে।
বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটের পেছনে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের দায় কোনোভাবেই কম নয়। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জ্বালানির প্রাথমিক উৎস নিশ্চিত না করেই একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র করা হয়। জ্বালানির আমদানিনির্ভরতার কারণে যুদ্ধ, মহামারিসহ বৈশ্বিক সংকটে বাংলাদেশকে ভুগতে হয়। এবার গ্রীষ্ম মৌসুমের বাড়তি চাহিদা ও ইরান যুদ্ধের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে সরকারকে অবশ্যই জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত সংস্কারে দীর্ঘমেয়াদি নীতিকৌশল প্রণয়ন করতে হবে।