নগর সরকার প্রতিষ্ঠা সবচেয়ে ভালো সমাধান

সম্পাদকীয়

অতিকেন্দ্রীভূত রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থা বাংলাদেশের সিটি করপোরেশনগুলোকে নামমাত্র স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছে। বিশেষজ্ঞরা এর সমাধান হিসেবে বছরের পর বছর ধরে নগর সরকারের কথা বলে আসছেন, কিন্তু বাস্তবে কোনো সরকারই ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের পথে হাঁটেনি।

এটা বললে অত্যুক্তি হবে না, ঢাকার দুই সিটি ও চট্টগ্রামের মেয়ররা কেউ ১ কোটি, কেউ ৩০ লাখ নাগরিকের মেয়র হওয়া সত্ত্বেও তাঁদের ক্ষমতা ও দায়িত্ব প্রকৃতপক্ষে পৌরসভার মেয়রদের চেয়েও কম। বাজেট থেকে শুরু করে নাগরিক সেবা—সবকিছুর জন্যই সিটি করপোরেশনগুলোকে নির্ভর করতে হয় ক্ষমতাসীন সরকার ও আমলাতন্ত্রের বদন্যতা, সিদ্ধান্ত ও সহযোগিতার ওপর। এমন একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে পরিকল্পিত নগর তো দূরে থাক, নাগরিক সেবা প্রত্যাশা করাটাও আকাশকুসুম কল্পনা।

গত রোববার (১১ জানুয়ারি, ২০২৬) ‘চট্টগ্রাম কবে বাণিজ্যিক রাজধানী হবে’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে পরিকল্পিত নগর গড়ে তুলতে হলে নগর সরকার প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি আবার উঠে এসেছে। আমরা মনে করি, রাজনৈতিক দলগুলোকে তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে নগর সরকার প্রতিষ্ঠার বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।

চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল ২০০৩ সালে। কিন্তু বাস্তবে চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে গড়ে তুলতে কোনো উদ্যোগই নেওয়া হয়নি। অথচ ভৌগোলিক অবস্থান ও বন্দরের সুবিধা কাজে লাগিয়ে শুধু বাণিজ্যিক রাজধানী নয়, চট্টগ্রামকে আঞ্চলিক ‘হাব’ হিসেবে গড়ে তোলারও সম্ভাবনা রয়েছে। চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার ঘিরে পর্যটনশিল্পের সম্ভাবনাও বহুগুণ বৃদ্ধি করা সম্ভব। কিন্তু নীতিনির্ধারকদের ইচ্ছা ও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা না থাকার কারণে চট্টগ্রাম হয়ে উঠেছে নাগরিক দুর্ভোগের অন্যতম কেন্দ্র।

গোলটেবিল বৈঠকে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র শাহাদাত হোসেন যথার্থই বলেছেন, নগর সরকার ছাড়া কোনো শহরকেই পরিকল্পিতভাবে পরিচালনা করা যায় না। খাল সংস্কারের দায়িত্ব সিটি করপোরেশন থেকে সরিয়ে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) কাছে দেওয়া এবং রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের ঘাড়ে চাপানোর উদাহরণ দেন তিনি। ৬ হাজার ১৪ কোটি টাকা ব্যয়ের পরও বাস্তবে চট্টগ্রাম নগরীর জলাবদ্ধতার খুব একটা উন্নতি হয়নি। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ও সিডিএর টানাপোড়েনে শহরটির বহু উন্নয়ন প্রকল্পই বাধাগ্রস্ত হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, সিডিএকে সহযোগী সংস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠা না করে কেন সিটি করপোরেশনের বিকল্প প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা হবে। ওয়াসা, ফায়ার সার্ভিস, পুলিশসহ বিভিন্ন সেবা প্রদানকারী সংস্থার সমন্বয়ের দায়িত্বও সিটি করপোরেশনের হাতে নেই। সিটি করপোরেশন ও মেয়রের দায়িত্ব ও ক্ষমতাকে এভাবে সংকুচিত করার কারণে নাগরিকদেরই ভুক্তভোগী হতে হয়। বড় কোনো দুর্যোগ, দুর্ঘটনা দেখা দিলে মেয়রদের অসহায়তা ও ক্ষমতাহীনতা প্রকটভাবে বেরিয়ে আসে।

বিশ্বের প্রায় সব উন্নত ও উন্নয়নশীল শহরে নগর সরকারব্যবস্থা চালু হলেও বাংলাদেশের সরকারগুলোর মধ্যে এ ব্যাপারে সব সময়ই অনীহা দেখা যায়। নীতিনির্ধারকদের এই অনীহার ঢাকাকেন্দ্রিক অতিকেন্দ্রীভূত একটি দেশ গড়ে উঠেছে। শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা—সবকিছুর জন্যই মানুষকে ঢাকায় আসতে হয়। বাস্তবে ঢাকা এখন প্রায় তিন কোটি মানুষের নগর। ফলে ঢাকার ওপর চাপ কমাতে চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলা এখন বাধ্যবাধকতাও হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আমরা আশা করি, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক না কেন, চট্টগ্রামকে প্রকৃতপক্ষেই বাণিজ্যিক রাজধানীতে পরিণত করতে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা ও উদ্যোগ নেবে। শহরটিকে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তুলতে হলে, সিটি করপোরেশন ও মেয়রের ক্ষমতা ও দায়িত্ব বাড়াতে হবে। নগর সরকার প্রতিষ্ঠা করাটাই হতে পারে সবচেয়ে ভালো সমাধান।