শ্রীকৃষ্ণের শিক্ষায় শিষ্টের পালন হোক

আজ শুভ জন্মাষ্টমী। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসবের এ দিন ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব তিথি হিসেবে উদ্‌যাপিত হয়। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, দ্বাপর যুগের সংকটময় সময়ে অধর্ম, অত্যাচার ও অরাজকতার অবসান এবং ধর্মের পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব। তাই জন্মাষ্টমী নিছক একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্যের মধ্যে রয়েছে ন্যায়, সত্য, কর্তব্য, সংযম ও মানবিকতা প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়। 

কংসের অত্যাচারের বিপরীতে শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব শুভ শক্তির জাগরণের প্রতীক। গীতায় তাঁর অমর বাণী ‘যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত, অভ্যুত্থানমধর্মস্য তদাত্মানং সৃজাম্যহম্’ অন্যায় ও অধর্মের বিরুদ্ধে ন্যায় ও সত্য প্রতিষ্ঠার এক চিরন্তন আহ্বান। অশুভর কাছে আত্মসমর্পণ নয়; কর্তব্য ও ন্যায়ের পথে অবিচল থাকার শিক্ষাই এর মূলকথা। 

আজকের অস্থির বিশ্বে এই শিক্ষার প্রাসঙ্গিকতা গভীর। যুদ্ধ, সংঘাত, সহিংসতা, নিপীড়ন ও প্রতিহিংসার বিস্তার মানুষের নিরাপত্তা ও শান্তিকে বিপন্ন করছে। শক্তির প্রদর্শন এবং প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করার প্রবণতা যখন রাজনীতির প্রধান চালিকা শক্তি হয়ে ওঠে, তখন সংযম ও মানবিকতার জায়গা সংকুচিত হয়। শ্রীকৃষ্ণের শিক্ষা মনে করিয়ে দেয়, শক্তির সঙ্গে বিবেক এবং কর্তব্যের সঙ্গে ন্যায়ের সমন্বয় না ঘটলে সেই শক্তি কল্যাণের বদলে ধ্বংস ডেকে আনতে পারে। 

বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই শিক্ষা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক বিভাজন যখন মতপার্থক্য অতিক্রম করে শত্রুতা ও বিদ্বেষে পরিণত হয়, তখন গণতান্ত্রিক সহাবস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ক্ষমতার পালাবদল যদি প্রতিহিংসা চরিতার্থের উপলক্ষ হয়ে ওঠে, ভিন্নমত দমন যদি রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ হয়ে দাঁড়ায়, তবে সমাজে সহনশীলতার পরিসর সংকুচিত হয়। শ্রীকৃষ্ণের কর্তব্যবোধ আমাদের শেখায় দায়িত্ব ব্যক্তিস্বার্থ, ক্ষমতার মোহ কিংবা প্রতিহিংসা দিয়ে পরিচালিত হতে পারে না; তা পরিচালিত হতে হবে ন্যায় ও বৃহত্তর কল্যাণের বোধ দ্বারা। 

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তাও একটি রাষ্ট্রের ন্যায়বোধের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। ধর্মীয় পরিচয় যা-ই হোক, নাগরিক অধিকার ও মর্যাদার ক্ষেত্রে সবার সমান নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। একইভাবে আইনের শাসন ও দুর্নীতির প্রশ্নেও শ্রীকৃষ্ণের শিক্ষা প্রাসঙ্গিক। আইন যদি সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ না হয় এবং অপরাধীর রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিচয় যদি তাকে দায়মুক্তির সুযোগ দেয়, তবে আইনের প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট হয়। 

জন্মাষ্টমীর প্রকৃত তাৎপর্য তাই কেবল আচার-অনুষ্ঠানে নয়; জীবনে ন্যায় ও মানবিকতার চর্চায়। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার পরিবর্তে সহনশীলতা, বিভেদের পরিবর্তে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, দুর্নীতির পরিবর্তে সততা, সহিংসতার পরিবর্তে সংযম এবং অন্যায়ের কাছে নীরবতার পরিবর্তে নৈতিক প্রতিবাদ—এই হোক জন্মাষ্টমীর অঙ্গীকার। অশান্ত সময়ে শ্রীকৃষ্ণের শিক্ষা আমাদের মনে করিয়ে দিক ন্যায়, সত্য ও মানবিকতার জয়েই ধর্মের প্রকৃত জয়।