খাবারের মান নিয়ে আপস করা যাবে না

আগামী বছর থেকে দেশের সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ‘মিড-ডে মিল’ চালুর সিদ্ধান্তটি প্রয়োজনীয় ও ইতিবাচক পদক্ষেপ বলেই আমরা মনে করি। দেশব্যাপী এই কর্মসূচি চালু হলে শিশুদের পুষ্টি পরিস্থিতি কিছুটা হলেও উন্নত হবে, একই সঙ্গে বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর হারও কমবে। তবে পাইলট প্রকল্প হিসেবে চালু থাকা এই কার্যক্রমে বিভিন্ন সময়ে খাবারের মান ও অব্যবস্থাপনা নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তাতে পুরোদমে স্কুল ফিডিং কার্যক্রম চালু করার আগেই একটি স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য ব্যবস্থাপনা এবং জবাবদিহির কাঠামো দাঁড় করানো জরুরি।

রাষ্ট্র প্রাথমিক শিক্ষাকে নীতিগতভাবে সর্বজনীন ও বাধ্যতামূলক করলেও দেশে এখনো ২২ শতাংশের বেশি মানুষ নিরক্ষর। এর অর্থ হলো দেশের বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠী অর্থনীতির মূল স্রোতে প্রবেশের জন্য ন্যূনতম যে শিক্ষা ও দক্ষতা প্রয়োজন, তার বাইরে থেকে যাচ্ছে। এটা সর্বজনস্বীকৃত যে জনগোষ্ঠীর একটি অংশের বিদ্যালয়ে না যাওয়া ও ঝরে পড়ার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো দারিদ্র্য ও বৈষম্য।

করোনা মহামারি এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অভিঘাত এবং বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার কারণে অর্থনীতিতে যে ধাক্কা লেগেছিল, তার প্রভাব শিক্ষা খাতেও এসে লাগে। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের ২০২৪ সালের বার্ষিক প্রাথমিক বিদ্যালয় শুমারির তথ্য বলছে, ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে প্রাথমিকে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর হার ৩ শতাংশ বেড়েছিল। অপেক্ষাকৃত দরিদ্র ও দুর্গম অঞ্চলেই ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের হার বেশি ছিল।

জাতিসংঘের সর্বশেষ খাদ্যনিরাপত্তা ও পুষ্টিবিষয়ক প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, বাংলাদেশে প্রায় ৩৮ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষের পুষ্টিকর খাবার কেনার সামর্থ্য নেই। এ প্রেক্ষাপটে শিক্ষার সুযোগবঞ্চিত শিশুদের বিদ্যালয়ে আনতে, ঝরে পড়ার হার কমাতে ও পুষ্টি পরিস্থিতি উন্নত করতে ‘মিড–ডে মিল’ একটি কার্যকর সমাধান হতে পারে। 

দেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৬৫ হাজার ৫৬৭টি। এসব বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৬ লাখ। বর্তমানে ১৫০টি উপজেলায় মিড–ডে মিল কর্মসূচি বাস্তবায়িত হচ্ছে। সব উপজেলায় কর্মসূচিটা চালু করা হলে বছরে ব্যয় হবে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা।

বর্তমানে মিড-ডে মিল হিসেবে বানরুটি, সেদ্ধ ডিম, কলা, ইউএইচটি দুধ ও ফর্টিফায়েড বিস্কুট দেওয়া হয়। এর মধ্যে বানরুটি, সেদ্ধ ডিম ও কলার মান নিয়ে নানা সময়ে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষকেরা অভিযোগ তুলেছেন। কয়েকটি এলাকায় পচা বা কাঁচা কলা, নষ্ট/দুর্গন্ধযুক্ত সেদ্ধ ডিম এবং নিম্নমানের বা মেয়াদোত্তীর্ণ রুটি সরবরাহ করার খবর সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হয়েছে।

এ প্রেক্ষাপটে খাবারের তালিকা সংশোধন এবং তদারকি ব্যবস্থায় অভিভাবকদের বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের মায়েদের সম্পৃক্ত করার পরামর্শ এসেছে। প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ জানিয়েছেন, পুষ্টিমান একই রেখে অন্য কোনো ধরনের খাবার দেওয়া যায় কি না, সে ব্যাপারে চেষ্টা চলছে। আমরা মনে করি, শিশুদের খাবারের মান ও পুষ্টির ক্ষেত্রে কোনো আপস করা চলবে না। বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে পুরোদমে কার্যক্রম চালুর আগেই খাবারের তালিকা নিয়ে সিদ্ধান্তে আসতে হবে।

বর্তমানে চালু থাকা প্রকল্পে ১৯টি প্রতিষ্ঠান খাবার সরবরাহ করে। তবে মূল প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আরও অনেক প্রতিষ্ঠান সহযোগী হিসেবে কাজ করে। এসব প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক প্রভাব ও পরিচয় ভূমিকা রেখেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে অবশ্যই মিড-ডে মিল কার্যক্রমে নিয়মিত তদারকি এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।