দক্ষিণাঞ্চলের নদ-নদী, খাল-বিল ও জলাভূমিতে ‘চায়না দুয়ারি’ জালের বিস্তার এখন মৎস্যসম্পদের জন্য গুরুতর হুমকি। মশারির মতো সূক্ষ্ম ফাঁসের এই জালে বড় মাছের পাশাপাশি নির্বিচার আটকা পড়ছে পোনা, ছোট মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণী। ফলে মাছের স্বাভাবিক প্রজনন ও বংশবিস্তার ব্যাহত হচ্ছে, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে জলজ প্রতিবেশব্যবস্থার ভারসাম্য। অল্প সময়ে বেশি মাছ পাওয়ার লোভে ব্যবহৃত এই জাল প্রকৃতপক্ষে ভবিষ্যতের মৎস্যসম্পদই ধ্বংস করছে।
বরিশাল, বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা, পিরোজপুর ও ঝালকাঠির নদী, খাল–বিলে এই জালের ব্যবহার ছড়িয়ে পড়েছে। বর্ষার শুরুতেই ফসলি জমির জলাশয় থেকে শুরু করে বিল ও খালে জাল পেতে রাখা হচ্ছে। অথচ বর্ষা দেশি বহু প্রজাতির মাছের প্রজননকাল। এই সময়ে পোনা ও প্রজননক্ষম মাছ নির্বিচার নিধন করা হলে মাছের মজুত যে দ্রুত হ্রাস পাবে, সেটিই স্বাভাবিক।
বিষয়টির ভয়াবহতা স্পষ্ট হয় সাম্প্রতিক গবেষণাতেও। ২০২৪ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় পটুয়াখালী ও বরগুনার দক্ষিণ-মধ্য উপকূলীয় অঞ্চলে ১০৫ প্রজাতির মাছ শনাক্ত হলেও এর মধ্যে ১১টি ঝুঁকিপূর্ণ, ১৪টি বিপন্ন এবং ৭টি মহাবিপন্ন শ্রেণির বলে চিহ্নিত হয়েছে। এই অবস্থায় চায়না দুয়ারির মতো নির্বিচার আহরণপদ্ধতির বিস্তার নিঃসন্দেহে সংকটকে আরও গভীর করবে।
আরও উদ্বেগের বিষয়, নিষিদ্ধ হওয়ার পরও এই জাল উৎপাদন ও বাজারজাত হচ্ছে। মৎস্য অধিদপ্তর বলছে, নির্ধারিত আকারের চেয়ে ছোট ফাঁসের জাল আইনত নিষিদ্ধ। বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ চায়না দুয়ারি জাল জব্দ ও ধ্বংসও করা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, জালগুলো উৎপাদন করছে কারা, বাজারে পৌঁছাচ্ছে কীভাবে? ঢাকার ডেমরা, পাবনাসহ বিভিন্ন এলাকায় অবৈধ উৎপাদন কারখানা থাকার অভিযোগ রয়েছে। অতএব শুধু জেলেদের ধরে জাল পুড়িয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। উৎপাদক, মজুতদার, পাইকার ও খুচরা বিক্রেতা—সবাইকে আইনের আওতায় আনতে হবে।
জেলেদের সচেতন করাও জরুরি। কেউ কেউ যে এই জাল নিষিদ্ধ, তা জানেন না। আবার মাছের প্রাপ্যতা কমে যাওয়ায় অনেক জেলে জীবিকার তাগিদে সহজ পদ্ধতির দিকে ঝুঁকছেন। তাঁদের জন্য বিকল্প জীবিকা, প্রশিক্ষণ ও বৈধ মাছ ধরার উপকরণের ব্যবস্থা করতে হবে। তবে জীবিকার সংকট অবৈধ ও ধ্বংসাত্মক পদ্ধতি ব্যবহারের বৈধতা দিতে পারে না।
চায়না দুয়ারির বিরুদ্ধে এখন প্রয়োজন বিচ্ছিন্ন অভিযান নয়, সমন্বিত ও ধারাবাহিক পদক্ষেপ। অবৈধ কারখানা বন্ধ, উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ নিয়ন্ত্রণ, হাটবাজারে নজরদারি এবং ব্যবহারকারীর বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ—সবই একসঙ্গে করতে হবে। কারণ, নদী-খাল-বিল শুধু আজকের মাছের ভান্ডার নয়, এগুলো ভবিষ্যৎ মৎস্যসম্পদ ও জলজ জীববৈচিত্র্যের আধার। আজকের অবিবেচক লোভে সেই আধার শূন্য করে ফেলা হলে আগামী প্রজন্মের কাছে তার দায় এড়ানোর কোনো উপায় থাকবে না।