রাজধানী ঢাকায় গৃহস্থালির অপরিহার্য উপাদান এলপিজি সিলিন্ডারের দাম সাধারণ মানুষের জন্য চরম ভোগান্তি তৈরি করেছে। সরকারি হিসাবে ১২ কেজির একটি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ২৫৩ টাকা হওয়ার কথা থাকলেও বাজারে তা বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ১০০ টাকায়। সরবরাহ–সংকটকে ব্যবহার করে একশ্রেণির ব্যবসায়ী বাজারে এ অস্থিতিশীলতা তৈরি করেছেন। দুঃখজনক হচ্ছে, সরকারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা এখানে কার্যকর কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না।
সংকটের শুরু মূলত আমদানিতে। লজিস্টিক বা পরিবহন খাতে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে; এলপিজি পরিবহনে ব্যবহৃত ২৯টি জাহাজ মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়ায় বাংলাদেশে গত মাসে আমদানি কমেছে প্রায় ৪০ শতাংশ। শীতকালে বিশ্ববাজারে এলপিজির উচ্চ চাহিদা এমনিতেই দাম বাড়িয়ে দেয়, তার ওপর আমদানির ঘাটতি মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমদানিকারকেরা বলছেন, চাহিদা অনুযায়ী সিলিন্ডার সরবরাহ করা যাচ্ছে না। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সরবরাহে ২০ শতাংশ ঘাটতি থাকলে খুচরা বাজারে দাম কেন প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যাবে? এখানে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়েছে, তা স্পষ্ট।
এই সংকটের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি)। সংস্থাটি প্রতি মাসে দাম নির্ধারণের গৎবাঁধা দায়িত্ব পালন করলেও সেই দাম বাজারে কার্যকর হচ্ছে কি না, তা দেখার সক্ষমতা বা সদিচ্ছা তাদের নেই বললেই চলে। শুধু চিঠি দিয়ে দায় সারছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। এতে অসাধু চক্র আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টার মতে, সরবরাহ না থাকলেও বেশি দামে ঠিকই গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে। এর মানে মজুতদারদের কাছে গ্যাস আছে, কিন্তু তারা সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে অতিরিক্ত মুনাফা লুটছে। জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সরকার সংস্থাগুলোর যে ধরনের কঠোর তদারকি ও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার কথা ছিল, তা মাঠপর্যায়ে অদৃশ্য। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের নীরবতাও এখানে প্রশ্নবিদ্ধ।
বিইআরসি ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে সমন্বিতভাবে সাঁড়াশি অভিযান চালাতে হবে। যেসব ডিস্ট্রিবিউটর বা খুচরা বিক্রেতা নির্ধারিত দামের চেয়ে এক টাকাও বেশি নেবে, তাদের লাইসেন্স বাতিলসহ কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে। দ্বিতীয়ত, জাহাজ–সংকট কাটাতে আমদানিকারকদের বিকল্প কোনো পথ বা ভিন্ন পতাকাবাহী জাহাজের ব্যবস্থা করতে সরকারকে নীতিগত সহায়তা দিতে হবে। তৃতীয়ত, আমদানিকারক থেকে খুচরা পর্যায় পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে রসিদ বা ভাউচার নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কোথায় দাম বাড়ছে, তা চিহ্নিত করা যায়।
বিইআরসির উচিত কেবল দাম নির্ধারণকারী সংস্থা হিসেবে নয়, বরং প্রকৃত নিয়ন্ত্রক হিসেবে আবির্ভূত হওয়া। প্রশাসন যদি এখনই বাজারে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে না পারে, তবে এলপিজির এই আগুন মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের রান্নাঘর ছাড়িয়ে সরকারের আস্থার ওপরেও গিয়ে পড়বে।