বন্য প্রাণীর নিরাপত্তায় গুরুত্ব দিন

সম্পাদকীয়

সুন্দরবনের শরকির খাল–সংলগ্ন বনে হরিণ শিকারের জন্য পাতা অবৈধ ফাঁদে আটকে পড়া একটি পূর্ণবয়স্ক বেঙ্গল টাইগারকে প্রায় ৩০ ঘণ্টা চেষ্টার পর উদ্ধার করা হয়েছে। এই ঘটনা কেবল একটি বন্য প্রাণী উদ্ধার অভিযানের বিবরণ নয়। এটি আমাদের পরিবেশ ব্যবস্থাপনা, আইন প্রয়োগের সক্ষমতা এবং প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের একটি গভীর সংকট সামনে এনেছে।

দেশের জাতীয় প্রাণী বেঙ্গল টাইগার কয়েক দিন ধরে ফাঁদে আটকে ছিল বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। সামনের বাঁ পায়ে গভীর ক্ষত নিয়ে সে যন্ত্রণায় ছটফট করেছে। যে ফাঁদ হরিণ ধরার জন্য পাতা হয়েছিল, সেটিই শেষ পর্যন্ত বাঘের পা আটকে দেয়। এটি নিছক দুর্ঘটনা নয়। এটি সুস্পষ্ট অপরাধ।

ঢাকা থেকে যাওয়া ভেটেরিনারি সার্জন ও বিশেষজ্ঞ দল এবং বন বিভাগের সমন্বিত প্রচেষ্টায় ট্রাঙ্কুলাইজারগান ব্যবহার করে বাঘটিকে অচেতন করা হয়, ফাঁদ থেকে মুক্ত করা হয়। এই উদ্ধার অভিযানে বন কর্মকর্তারা পেশাদারত্ব ও সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। দুর্গম বনাঞ্চল, নিরাপত্তাঝুঁকি এবং উৎসুক জনতার চাপ সামলেও দায়িত্ব পালন করা সহজ কাজ নয়।

তবে এই সাফল্যের মধ্যেও স্বস্তির সুযোগ নেই। বরং প্রশ্ন আরও জোরালো হয়। বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনে অবৈধ শিকারের ফাঁদ কীভাবে নিয়মিত বসানো সম্ভব হচ্ছে? নজরদারি ব্যবস্থায় কোথায় ঘাটতি রয়ে যাচ্ছে? স্থানীয় অপরাধী চক্রের সঙ্গে কারা জড়িত এবং তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা কেন দৃশ্যমান নয়? একটি বাঘ উদ্ধার হওয়া যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঠেকানো আরও বেশি জরুরি।

এ ঘটনার আরেকটি দিক মানুষের নিরাপত্তা ও আতঙ্ক। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে লোকালয়ের কাছাকাছি বাঘের আনাগোনা স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ভীতির সৃষ্টি করেছে। এই ভীতি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে এটিও সত্য যে বনাঞ্চল সংকুচিত হওয়া, প্রাকৃতিক শিকার কমে যাওয়া এবং মানুষের অনিয়ন্ত্রিত প্রবেশ বাঘকে বাধ্য করছে মানুষের কাছাকাছি আসতে। এটি মানুষের তৈরি সংকটের প্রতিক্রিয়া।

সুন্দরবনের প্রাণপ্রকৃতি ও মানুষের সহাবস্থান রক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া বিকল্প নেই। আমরা আশা করি চোরা শিকার বন্ধ করতে কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর বিকল্প জীবিকার সুযোগ সৃষ্টি করা হবে। বন বিভাগকে আধুনিক প্রযুক্তি, পর্যাপ্ত জনবল ও প্রশিক্ষণ দিয়ে শক্তিশালী করা হবে। নিয়মিত টহল, গোয়েন্দা নজরদারি এবং স্থানীয় প্রশাসনের কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করাও জরুরি। আহত বাঘের পা থেকে ফাঁদ খুলে দেওয়া একটি তাৎক্ষণিক দায়িত্ব। কিন্তু প্রকৃত দায়িত্ব হলো এমন একটি বাস্তবতা গড়ে তোলা, যেখানে আর কোনো বন্য প্রাণীকে এভাবে যন্ত্রণায় আটকে থাকতে হবে না।