দ্রুত চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগ দিন

সম্পাদকীয়

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের (টিআই) দুর্নীতির ধারণাসূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে অবনমন ঘটেছে। এই বাস্তবতায় দেশের প্রধান দুর্নীতিবিরোধী প্রতিষ্ঠান দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সাড়ে তিন মাস ধরে কমিশনহীন অবস্থায় থাকাটা কেবল গভীর উদ্বেগের নয়, দুর্নীতিবাজদের প্রশ্রয় দেওয়ারও শামিল।

বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানগুলোর শীর্ষ পদে রাজনৈতিক বিবেচনায় রদবদলের যে অঘোষিত রেওয়াজ চালু রয়েছে, দুদকের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম দেখা যায়নি। বিএনপি সরকার গঠনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে নিয়োগ পাওয়া দুদকের চেয়ারম্যান আব্দুল মোমেনসহ আরও দুই কমিশনার পদত্যাগ করেন। বিদ্যমান আইন অনুযায়ী, পদত্যাগের ৩০ দিনের মধ্যে কমিশন পুনর্গঠনের বিধান থাকলেও সেটা মানা হয়নি।

চেয়ারম্যানসহ কমিশনাররা পদত্যাগ করায় কার্যত দুদকের কার্যক্রমে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। প্রতিদিন পাঁচ–ছয়টি নতুন দুর্নীতির অভিযোগ জমা পড়লেও কমিশনের অনুমোদন না হওয়ায় সেগুলোর অনুসন্ধান হচ্ছে না। মামলা দায়ের, তদন্ত প্রতিবেদন অনুমোদন, অভিযোগপত্র দাখিল, সম্পত্তি জব্দ, বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞার মতো নিয়মিত কার্যক্রমও স্থবির হয়ে পড়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গঠিত শ্বেতপত্র কমিটির তথ্য বলছে, চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বাংলাদেশ থেকে ২৬০ বিলিয়ন ডলার বা ২৯ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছে। এই তথ্যই বলে দেয় দুর্নীতি কতটা সর্বব্যাপী ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা ও রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে যেসব রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও শীর্ষ পদে থাকা কর্মকর্তা দুর্নীতির মাধ্যমে দেশে–বিদেশে অগাধ সম্পদের মালিক হয়েছেন, তাঁদের সবাইকে জবাবদিহির আওতায় আনা অত্যন্ত জরুরি। দুদক অকার্যকর অবস্থায় থাকায় আওয়ামী লীগ আমলের বড় দুর্নীতিগুলোর অনুসন্ধান ও তদন্তও থেমে আছে।

দুদক নিষ্ক্রিয় থাকা মানে হচ্ছে দুর্নীতিবাজদের কাছে এমন বার্তা যাওয়া যে দুর্নীতি ও অপরাধ করলেও পার পাওয়া যায়। আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে, অভিযোগ তদন্তে বিলম্ব হলে অনেক ঘটনার আলামত যেমন নষ্ট হতে পারে, আবার অনেক দুর্নীতিবাজ তাদের অবৈধ সম্পদ বিক্রি করে দিতে পারে। এটি নিঃসন্দেহে দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়ার ক্ষেত্রে সরকারের অঙ্গীকারের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। এই বাস্তবতায় দুর্নীতির ধারণাসূচকে বাংলাদেশের অবস্থানের আরও অবনতি হতে পারে বলে দুদকের সাবেক মহাপরিচালক মঈনুল ইসলাম যে আশঙ্কা করেছেন, সরকারকে তার গুরুত্ব উপলব্ধি করা জরুরি বলে আমরা মনে করি। সরকারকে সার্চ কমিটি পূর্ণাঙ্গ করে চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগের মধ্য দিয়ে দুদকের স্থবিরতা কাটাতে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।

দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি। টিআইয়ের সর্বশেষ ধারণাসূচকে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে দুর্নীতির ক্ষেত্রে কেবল যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তানের অবস্থান বাংলাদেশের নিচে ছিল। এর সবচেয়ে বড় কারণ হলো, বিগত সরকারগুলো দুদককে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিল এবং প্রতিষ্ঠানটিকে ‘নখদন্তহীন বাঘে’ পরিণত করেছিল।

আমরা মনে করি, দুদককে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের এই চক্র থেকে বের করে আনা না গেলে দুর্নীতির পাগলা ঘোড়াকে লাগাম পরানো সম্ভব নয়। একমাত্র একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ দুদকই সেই ভূমিকা পালন করতে পারে। দুঃখজনক হলেও সত্যি, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দুদক সংস্কারে গঠিত কমিশনের প্রতিবেদন অনেকটাই কাটছাঁট করে অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল। বর্তমান সরকারের আমলে দুদক সংস্কারের অধ্যাদেশটি সংসদের প্রথম অধিবেশনে উত্থাপন না করায় সেটি আর আইনে পরিণত হয়নি। যদিও সরকারের তরফ থেকে বলা হয়েছে, দুদক সংস্কারে একটি নতুন আইন করা হবে। তবে এর সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়নি।

দুর্নীতিকে রুখতে হলে প্রতিষ্ঠান হিসেবে দুদককে শক্তিশালী করার বিকল্প নেই। আমরা আশা করি, অতীত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে রাজনৈতিক বিবেচনার ঊর্ধ্বে উঠে পেশাদার, সৎ ও নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের দিয়ে দুদক কমিশন পুনর্গঠন করা হবে।