মালয়েশিয়া ও চীন সফরের বার্তা ইতিবাচক

সম্পাদকীয়

নতুন সরকারের প্রথম বড় কূটনৈতিক উদ্যোগ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফরকে একই সঙ্গে সফল এবং তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। নতুন প্রধানমন্ত্রীর প্রথম সফর হিসেবে এই দুটি দেশকে বেছে নিয়ে সরকার কৌশলগতভাবেও বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছে। এই সফরের মধ্য দিয়ে সরকার একদিকে অর্থনীতি, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের নতুন সুযোগ খুঁজেছে, অন্যদিকে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক রাজনীতিতে নিজেদের স্বকীয় অবস্থানের একটি বার্তাও দিয়েছে।

মালয়েশিয়া ও চীন দুই দেশেই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী উষ্ণ অভ্যর্থনা পেয়েছেন। মালয়েশিয়া বাংলাদেশের অন্যতম এশীয় বাণিজ্য অংশীদার এবং এক বিশাল শ্রমবাজার। বর্তমানে বন্ধ থাকা সেখানকার শ্রমবাজার খুলে দেওয়ার বিষয়টি এই সফরে গুরুত্ব পেয়েছে। এ-সংক্রান্ত যৌথ কমিশন নতুন করে সক্রিয় করার সিদ্ধান্ত হয়েছে এই সফরে। মুক্ত বাণিজ্যচুক্তির আলোচনাও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে দুই পক্ষ একমত হয়েছে। এগুলো সবই ইতিবাচক অগ্রগতি।

প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের মধ্য দিয়ে যে বার্তা পাওয়া গেল, তা হচ্ছে দুই দেশই সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে চায়। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আস্থা ও পারস্পরিক সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করেই দেশ দুটি এই পথে এগোবে। ‘অভিন্ন ভবিষ্যৎ’ অংশীদারত্ব প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে এই উত্তরণ ঘটবে। আরেকটি বার্তা হচ্ছে, অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক পরিসরের বাইরে দুই দেশ রাজনৈতিক পরিসরের যুক্ততার দিকেও মনোযোগী হয়েছে। বাংলাদেশ-চীন যৌথ ইশতেহারের তার প্রতিফলন রয়েছে। তবে এটা কোন মাত্রায় বা কীভাবে হবে, তা বোঝার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।

চীন বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্যিক অংশীদার। অবকাঠামো উন্নয়ন, জ্বালানি, শিল্প, যোগাযোগ ও বিনিয়োগে দেশটির ভূমিকা গত এক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সফরের সময় এবার চুক্তি ও সমঝোতা স্মারকসহ ১৭টি দলিল সই হয়েছে। নতুন বিনিয়োগ, শুল্কসুবিধা, বন্দর উন্নয়ন, অর্থনৈতিক অঞ্চল, নদী ব্যবস্থাপনা এবং অর্থনৈতিক করিডরের মাধ্যমে সংযোগব্যবস্থা—এসব নিয়ে যে আলোচনা ও সমঝোতা হয়েছে, সেগুলো ধরে এগোনো গেলে বাংলাদেশের অর্থনীতি ভবিষ্যতে ইতিবাচক সুফল পেতে পারে।

তবে আমাদের মনে রাখতে হবে যে প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের একটি ভূরাজনৈতিক দিকও রয়েছে। বঙ্গোপসাগর, সমুদ্রকেন্দ্রিক সহযোগিতা, আঞ্চলিক সংযোগ, বন্দর উন্নয়ন বা নিরাপত্তা সহযোগিতার মতো বিষয়গুলো এখন শুধু অর্থনৈতিক নয়; আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতারও অংশ। আমরা দেখছি যে দক্ষিণ এশিয়া ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতের কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা নতুন মাত্রা পাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরকে সেই দিক থেকেও বিচার-বিশ্লেষণ করতে হবে।

স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি হচ্ছে সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়। সময়ের সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাস্তবতা বদলেছে, কিন্তু এই নীতির মৌলিক গুরুত্ব কমেনি; বরং বর্তমান বহু মেরুকেন্দ্রিক বিশ্বে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতির প্রয়োজন আরও বেড়েছে। বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে সব পক্ষের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা। সে ক্ষেত্রে নতুন সরকারের ঘোষিত অবস্থান ‘সবার আগে বাংলাদেশ’, এই ধারণাকে কার্যকরভাবে প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিতে হবে।

ভারত বাংলাদেশের নিকটতম প্রতিবেশী। দুই দেশের সম্পর্ক শুধু কূটনৈতিক নয়; অর্থনীতি, নিরাপত্তা, জ্বালানি, যোগাযোগ, নদীর পানিবণ্টনসহ বহু বাস্তব স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত। অন্যদিকে চীন বাংলাদেশের অন্যতম উন্নয়ন সহযোগী ও গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদার। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ বাংলাদেশের রপ্তানি, বিনিয়োগ এবং উন্নয়ন সহযোগিতার প্রধান উৎস। এসব বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই আমাদের এগোতে হবে।

 প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফর সম্ভাবনার একটি নতুন অধ্যায় খুলে দিয়েছে। এখন প্রয়োজন সমঝোতার ক্ষেত্রগুলো বিচার-বিশ্লেষণ করে তার সুপরিকল্পিত বাস্তবায়ন, কৌশলগত সংযম এবং সর্বোপরি জাতীয় স্বার্থকে সবার ওপরে জায়গা দেওয়ার নীতিতে অটল থাকা।