রক্ষণাবেক্ষণে অবহেলা কোনোভাবে কাম্য নয়

সম্পাদকীয়

পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম অঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন এবং অবহেলিত পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জীবনমান সহজ করার ক্ষেত্রে খাগড়াছড়ির ‘স্বর্গের সিঁড়ি’ ছিল একটি অনন্য ও প্রশংসনীয় উদ্যোগ। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১ হাজার ২০৮ ফুট উচ্চতার ‘মায়ুং কপাল’ বা হাতিমাথা পাহাড়ে যাতায়াতের জন্য ২০১৫ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড ৩০০ ধাপের এই লোহার সিঁড়িটি নির্মাণ করে। সেই সিঁড়ি এখন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

দীর্ঘ খাড়া পাহাড় বেয়ে ও গাছ ধরে বিপজ্জনকভাবে যাতায়াত করা ১৫টি ত্রিপুরা পাড়ার মানুষের জীবনে স্বস্তি ফিরে এসেছিল; সহজ হয়েছিল উৎপাদিত কৃষিপণ্য বাজারে নেওয়া। এমনকি রোমাঞ্চপ্রিয় পর্যটকদের কাছেও এটি জেলার অন্যতম প্রধান দর্শনীয় স্থান হয়ে উঠেছিল। পরিতাপের বিষয়, গত এক দশকে কোনো ধরনের রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কার না করায় স্থানীয়দের আশার সেই ‘স্বর্গের সিঁড়ি’ এখন এক চরম মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে।

৩০৮ ফুট দীর্ঘ লোহার এই সিঁড়ির এখন জরাজীর্ণ দশা। পুরো কাঠামোতে মরিচা ধরেছে, ভেঙে গেছে বহু লোহার ধাপ, নড়বড়ে হয়ে পড়েছে দুই পাশের রেলিং। অবস্থা এতটাই বেগতিক যে কোথাও কোথাও লোহার ধাপ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় পাড়াবাসীরা নিজেদের উদ্যোগে কাঠ বেঁধে বিপজ্জনকভাবে চলাচলের ব্যবস্থা করেছেন। বর্তমানে বর্ষার কারণে এই পিচ্ছিল ও ভাঙা সিঁড়ি বেয়ে প্রতিদিন শত শত পাহাড়ি শিক্ষার্থী, নারী ও বয়োবৃদ্ধের যাতায়াত করতে হচ্ছে চরম জীবনঝুঁকি নিয়ে। বিকল্প কোনো পথ না থাকায় প্রতিদিন তাঁরা একবুক আতঙ্ক নিয়ে এই সিঁড়ি মাড়াচ্ছেন।

দুর্গম পাহাড়ের মানুষের এই দুর্ভোগ কেবল যাতায়াতের কষ্টেই সীমাবদ্ধ নেই, এটি স্থানীয় পাহাড়ি অর্থনীতির ওপরও বড় আঘাত হানছে। সিঁড়িটি জরাজীর্ণ হয়ে পড়ায় আগের মতো পাইকারি ব্যবসায়ীরা এখন পাহাড়ে গিয়ে কৃষিপণ্য কিনছেন না, পর্যটকদের আগমনও গেছে কমে। ফলে স্থানীয় জুমচাষি ও বাগানমালিকেরা অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। অথচ প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে যে ধরনের জরুরি তৎপরতা দেখানো উচিত ছিল, তা আমলাতান্ত্রিক ধীরগতির বৃত্তেই আটকে আছে। জেলা প্রশাসক পরিদর্শনের পর উন্নয়ন বোর্ডকে জানালেও, উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীর বক্তব্যে কেবল আগামী শুষ্ক মৌসুমে ‘সংস্কারের পরিকল্পনা’র চেনা বুলি শোনা গেছে।

বর্ষার এই ভরা মৌসুমে যখন প্রতিদিন বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, তখন আগামী শুষ্ক মৌসুম বা শীতকাল পর্যন্ত এই ঝুঁকিপূর্ণ জনগুরুত্বপূর্ণ কাঠামোটিকে ফেলে রাখা চরম দায়িত্বহীনতার শামিল। আমরা মনে করি, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের উচিত আর কালক্ষেপণ না করে অনতিবিলম্বে এই সিঁড়ি সংস্কারের কাজ শুরু করা। কোনো বড় ধরনের প্রাণহানি বা দুর্ঘটনার পর প্রশাসনের ঘুম ভাঙবে—এমনটা কখনোই কাম্য নয়।