নাগরিকের সঙ্গে এ কেমন পরিহাস

সম্পাদকীয়

একটি সেতু নির্মিত হয় দুই তীরের মানুষকে সংযুক্ত করতে, যাতায়াত সহজ করতে। কিন্তু চট্টগ্রামের হাটহাজারীর দক্ষিণ মাদার্শা ইউনিয়নে কাটাখালী খালের ওপর নির্মিত ‘আবুল খায়ের গার্ডার ব্রিজ’টি যেন উন্নয়ন-পরিকল্পনার এক অদ্ভুত তামাশা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চার বছর আগে ৮৭ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই সেতুর দুই পাশে নেই কোনো সংযোগ সড়ক, এমনকি সেতুর ঠিক মুখেই দাঁড়িয়ে আছে বৈদ্যুতিক খুঁটি। ফলে সরকারের বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও গত চার বছরে স্থানীয় ৫০ হাজার মানুষের ভাগ্যে জোটেনি কাঙ্ক্ষিত সুফল।

প্রশ্ন উঠেছে, এটি পরিকল্পনার ঘাটতি নাকি দায়িত্বহীনতা? প্রথম আলোর প্রতিবেদন জানাচ্ছে, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের অর্থায়নে ২০২১-২২ অর্থবছরে ৪৫ ফুট দীর্ঘ এই সেতুর নির্মাণকাজ শেষ হয়। আশ্চর্যের বিষয় হলো নির্মাণের চার বছর পার হয়ে গেলেও সংযোগ সড়ক কেন করা হলো না, তার সদুত্তর মেলেনি। একটি সেতু নির্মাণের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো সংযোগ সড়ক। সড়কহীন সেতু যে কেবল কংক্রিটের একটি অকেজো কাঠামো মাত্র—এই সাধারণ জ্ঞানটুকু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ছিল না, তা বিশ্বাস করা কঠিন। সেতুর মুখে বৈদ্যুতিক খুঁটি রেখে কাজ শেষ করা প্রকৌশলগত দূরদর্শিতার অভাব এবং চরম সমন্বয়হীনতারই বহিঃপ্রকাশ।

এই একটি সেতুর অভাবে ১০-১২টি গ্রামের মানুষকে দীর্ঘ পথ ঘুরে যাতায়াত করতে হচ্ছে। বিশেষ করে বিভিন্ন স্কুল-কলেজের প্রায় ছয় হাজার শিক্ষার্থী প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পুরোনো সাঁকো দিয়ে খাল পার হচ্ছে। এতে যেমন সময়ের অপচয় হচ্ছে, তেমনি প্রায়ই ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা। এলাকাবাসী বারবার বিদ্যুৎ বিভাগকে খুঁটি সরানোর অনুরোধ জানালেও কেন কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হলো না, তা বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সমন্বয়হীনতার সংস্কৃতি থেকে মুক্তি মিলবে কবে? ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বক্তব্যে আবারও সেই চিরচেনা ‘দায় চাপানোর’ সংস্কৃতি ফুটে উঠেছে। পিআইও কার্যালয় বলছে, এলজিইডি সড়ক করবে আর ঠিকাদার বলছেন পিচঢালা সড়ক অসম্পূর্ণ। এই যে দপ্তরের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব, তার খেসারত দিচ্ছে সাধারণ মানুষ। জনস্বার্থের চেয়ে প্রশাসনিক আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এখানে বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আমাদের প্রত্যাশা, হাটহাজারী উপজেলা প্রশাসন এবং এলজিইডি দ্রুততম সময়ের মধ্যে সমন্বয় করে সংযোগ সড়ক নির্মাণের কাজ শেষ করবে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ বিভাগকে জরুরি ভিত্তিতে ওই বৈদ্যুতিক খুঁটি অপসারণের ব্যবস্থা নিতে হবে। ৮৭ লাখ টাকার সরকারি সম্পদ এভাবে ফেলে রাখা কেবল অর্থের অপচয় নয়, বরং জনগণের সঙ্গে একধরনের পরিহাস। অবিলম্বে এই সেতু চলাচলের উপযোগী করে এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের ভোগান্তি লাঘব করা হোক।