চট্টগ্রামে প্রশিক্ষিত ‘শুটার’

বন্দরনগরী চট্টগ্রামে সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া অপরাধের যে চিত্র সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে, তা কেবল উদ্বেগজনক নয়; বরং জননিরাপত্তার জন্য এক চরম অশনিসংকেত। জনাকীর্ণ স্থানে নির্দিষ্ট কাউকে লক্ষ্য করে নির্ভুল নিশানায় গুলি, পুলিশি পাহারায় থাকা ব্যবসায়ীর বাড়িতে প্রকাশ্যে গোলাবর্ষণ কিংবা চলন্ত গাড়িতে মুহুর্মুহু গুলি চালিয়ে হত্যাকাণ্ড—এসবই বলে দিচ্ছে অপরাধীরা কতটা বেপরোয়া। সবচেয়ে আতঙ্কের বিষয় হলো এসব হামলায় সাধারণ অস্ত্রের বদলে ব্যবহৃত হচ্ছে সাবমেশিনগান (এসএমজি) ও চায়নিজ রাইফেলের মতো অত্যাধুনিক যুদ্ধাস্ত্র।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দাবি অনুযায়ী, এসব ঘটনার নেপথ্যে রয়েছে বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলীর প্রশিক্ষিত ‘শুটার বাহিনী’। পুলিশের প্রাথমিক তথ্যমতে, অন্তত ৫০ জন প্রশিক্ষিত শুটার নগর ও জেলার বিভিন্ন এলাকায় দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে তাদের অস্ত্র চালনার ধরন এবং শীতল মস্তিষ্কে আক্রমণ চালিয়ে পালিয়ে যাওয়ার কৌশল দেখে বিশেষজ্ঞরাও নিশ্চিত যে এরা বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। প্রশ্ন জাগে, দেশের ভেতরে রাউজান বা রাঙ্গুনিয়ার মতো দুর্গম এলাকায় এই বিশাল বাহিনী কীভাবে প্রশিক্ষণ নিচ্ছে? প্রশাসনের নজরদারি এড়িয়ে কীভাবে সীমান্ত পার হয়ে শহরে ঢুকছে এসব ভারী আগ্নেয়াস্ত্র?

চট্টগ্রামের এই ‘শুটার সংস্কৃতি’ মূলত গড়ে উঠেছে চাঁদাবাজি ও রাজনৈতিক আধিপত্যকে কেন্দ্র করে। কোটি টাকা চাঁদা না পেয়ে কোনো ব্যবসায়ীর বাড়িতে গুলি ছোড়া কিংবা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে পথের কাঁটা সরাতে ভাড়াটে খুনি ব্যবহার করা এখন নৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। অপরাধীরা এ, বি এবং সি ক্যাটাগরিতে বিভক্ত হয়ে যেভাবে সুশৃঙ্খলভাবে অপরাধ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে, তা কোনো সাধারণ গ্যাং নয়; বরং একটি সমান্তরাল মাফিয়া শাসনকাঠামোরই ইঙ্গিত দেয়।

দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, অপরাধীদের শনাক্ত করার দাবি করলেও পুলিশ এখনো মূল হোতাদের বা অস্ত্রের উৎসের নাগাল পায়নি। বিদেশে বসে কেউ নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করছে আর দেশে তার সহযোগীরা একের পর এক খুন করে ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে—এটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তোলে। ‘তদন্ত চলছে’ কিংবা ‘শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে’ জাতীয় চিরাচরিত বুলি দিয়ে সাধারণ মানুষের আতঙ্ক দূর করা সম্ভব নয়।

আমরা মনে করি, চট্টগ্রামের এই অস্ত্রবাজি বন্ধ করতে হলে শুধু ‘চুনোপুঁটি’ ধরে লাভ নেই। প্রথমত, অত্যাধুনিক অস্ত্রের উৎস ও পাচারকারী চক্রকে গুঁড়িয়ে দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় সন্ত্রাসীদের যে প্রশিক্ষণ আস্তানা রয়েছে, সেখানে সাঁড়াশি অভিযান চালানো জরুরি। তৃতীয়ত, বিদেশে পলাতক অপরাধীদের ইন্টারপোলের মাধ্যমে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। 

আমরা আশা করি, প্রশাসন আর কোনো কালক্ষেপণ না করে চট্টগ্রামের এই অদৃশ্য মারণাস্ত্র ও প্রশিক্ষিত শুটারদের নির্মূলে কঠোরতম ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।