বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি ও চুরির ঘটনা নতুন নয়। কিন্তু ‘নিরাপদ’ ও বহুস্তরীয় নজরদারি–ব্যবস্থার মধ্য দিয়েই ৮১ লাখ টাকার জেট ফুয়েল কাগজে-কলমে গ্রহণ দেখিয়ে গায়েব হয়ে যাওয়াটা বেশ বিস্ময়কর। এ ঘটনা তাই শুধু একটি চুরি নয়; এটি রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি, প্রশাসনিক সততা ও নিরাপত্তাব্যবস্থার ভয়াবহ ভঙ্গুরতার প্রতীক। পদ্মা অয়েল পিএলসির গোদনাইল ডিপো থেকে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কুর্মিটোলা এভিয়েশন ডিপোতে পাঠানো ৭২ হাজার লিটার জেট ফুয়েল বাস্তবে ডিপোতে না পৌঁছেও কাগজে গ্রহণ দেখানোর ঘটনা দেশের জ্বালানি খাতের গভীরে প্রোথিত দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরেছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো এই চুরি কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যক্তির তাৎক্ষণিক অপকর্ম নয়; বরং এটি ছিল পরিকল্পিত, সংঘবদ্ধ ও বহুস্তরীয় জালিয়াতির ফল। তদন্ত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ট্যাংকলরিগুলো ডিপোতে ঢোকেনি, অথচ নিবন্ধন বইয়ে প্রবেশ দেখানো হয়েছে। জ্বালানি গ্রহণের নথিতে সই হয়েছে, তেলের গভীরতা ও তাপমাত্রা পর্যন্ত উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি পরদিন ট্যাংকের হিসাবের গরমিল ঢাকতে ‘পরিবহন ক্ষতি’ দেখিয়ে রেকর্ডে কাটাছেঁড়া ও ঘষামাজা করা হয়েছে। অর্থাৎ পুরো ব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন।
এখানে একটি বড় প্রশ্ন সামনে আসে—যে ব্যবস্থাকে এত দিন ‘নিরাপদ’ বলা হচ্ছিল, সেটি কতটা কার্যকর? নিবন্ধন বই, সিসিটিভি ফুটেজ, ডিপ রেকর্ড, তাপমাত্রা ও ঘনত্বের তথ্য—সবকিছু থাকার পরও যদি এমন চুরি সম্ভব হয়, তবে বোঝা যায় প্রযুক্তি বা নিয়ম নয়, মূল সংকট মানুষের সততা ও জবাবদিহির অভাব। দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা যখন পুরো ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করে, তখন সবচেয়ে শক্তিশালী নিরাপত্তাব্যবস্থাও কাগুজে হয়ে পড়ে।
ঘটনার আরেকটি ভয়াবহ দিক হলো এটি বিমান চলাচল সংশ্লিষ্ট জ্বালানি নিয়ে ঘটেছে। জেট ফুয়েল শুধু অর্থনৈতিক সম্পদ নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গেও যুক্ত। এ ধরনের জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থায় অনিয়ম বা চুরি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ীও গুরুতর অপরাধ। কারণ, এতে শুধু আর্থিক ক্ষতি নয়, বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ও জ্বালানির নির্ভরযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। বাংলাদেশের মতো একটি দেশে যেখানে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দেশের ভাবমূর্তির গুরুত্বপূর্ণ অংশ, সেখানে এমন কেলেঙ্কারি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
তদন্ত প্রতিবেদনে কুর্মিটোলা এভিয়েশন ডিপোর ব্যবস্থাপককে মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আরও কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংশ্লিষ্টতার কথাও উঠে এসেছে। তাঁদের সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে, যা প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে প্রয়োজনীয়। কিন্তু অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, শুধু সাময়িক বরখাস্ত বা বিভাগীয় ব্যবস্থা নিয়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দায় শেষ হয়ে যায়। দীর্ঘসূত্রতা, রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে বড় দুর্নীতির বিচার শেষ পর্যন্ত আর আলোর মুখ দেখে না। ফলে অপরাধীরা যেমন পার পেয়ে যায়, তেমনি দুর্নীতির সংস্কৃতিও টিকে থাকে।
আলোচিত এ ঘটনার আরও বিস্তৃত তদন্ত হওয়া জরুরি। শুধু পাঁচজনকে দায়ী করলেই দায়িত্ব শেষ হবে না। তদন্তে বের করতে হবে, এই চক্রের পেছনে আরও কারা ছিল, কোথায় তেল বিক্রি করা হয়েছে এবং এত বড় অনিয়ম এত দিন কীভাবে নজর এড়িয়ে গেছে। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে, পদ্মা অয়েল ও বিপিসির অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা ও তদারকি ব্যবস্থা এত দুর্বল কেন? নিয়মিত অডিট ও পর্যবেক্ষণ কার্যকর থাকলে এমন জালিয়াতি হওয়ার কথা নয়।
সবচেয়ে বড় কথা, রাষ্ট্রীয় সম্পদ আত্মসাৎকে ‘সাধারণ দুর্নীতি’ হিসেবে দেখার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। জনগণের অর্থে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের চুরি আসলে জনগণের অধিকার লুণ্ঠন। দুর্নীতির বিরুদ্ধে এখনই কঠোর অবস্থান না নিলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি মানুষের আস্থাও একসময় পুরোপুরি উধাও হয়ে যাবে।