সংকট সমাধানে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিন

সম্পাদকীয়

ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিতে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। চেয়ারম্যান নিয়োগের পর নানা বিতর্ক ও চলমান আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাংকটি থেকে গ্রাহকেরা গত কয়েক দিনে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকার বেশি তুলে নিয়েছেন। উদ্বেগজনক বিষয় হচ্ছে, এটি এখন সরকারি দল ও বিরোধী দলের রাজনৈতিক টানাপোড়েনের বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি) গত বুধবার গভর্নরের সঙ্গে অনুষ্ঠিত ব্যাংকার্স সভায় বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংক ইসলামী ব্যাংকে পর্যবেক্ষক নিয়োগ দিয়েছে। আমরা মনে করি, রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে বেরিয়ে ইসলামী ব্যাংক ঘিরে সৃষ্ট সংকটের যৌক্তিক ও গ্রহণযোগ্য সমাধান করা বাংলাদেশ ব্যাংকের আশুকর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ব্যাংকটি ঘিরে যে সংকট ও অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে, তার গভীর প্রভাব ব্যাংক খাতে পড়তে শুরু করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মনে রাখা প্রয়োজন যে দেশের সবচেয়ে বেশি প্রবাসী আয় আসে এই ব্যাংকটিতে। ফলে ব্যাংকটিতে সংকট দীর্ঘমেয়াদি হলে প্রবাসী আয়, ডলারের দাম, তারল্য ও আন্তব্যাংক সম্পর্কে ধারাবাহিক প্রভাব পড়তে বাধ্য।

গত ২৪ মে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর মো. খুরশীদ আলমকে ইসলামী ব্যাংকের স্বতন্ত্র পরিচালক ও নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার পর নতুন করে এবারের সংকট তৈরি হয়। নতুন চেয়ারম্যানের পদত্যাগের দাবিতে সচেতন গ্রাহক ফোরামের ব্যানারে আন্দোলন শুরু করে এবং একপর্যায়ে গ্রাহকদের একটি অংশ ব্যাংকটি থেকে টাকা তুলে নিতে শুরু করে। এই আন্দোলনের পেছনে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর সমর্থন রয়েছে। ৩ জুন জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বলেছেন, বিরোধী দলের নেতা-কর্মীরা ইসলামী ব্যাংক রক্ষায় মাঠে নামতে প্রস্তুত। বিরোধী দলের এটা মনে রাখা প্রয়োজন, কোনো ব্যাংক কখনো কোনো দলের হতে পারে না। আন্দোলন সৃষ্টি করে তাঁরা দাবি আদায়ের যে পথ নিয়েছেন, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

জাতীয় সংসদের চলমান বাজেট অধিবেশনে ইসলামী ব্যাংক নিয়ে সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে বিতর্ক তৈরি হয়। সরকারি দলের অভিযোগ, ইসলামী ব্যাংকের টাকা ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খরচ করা হয়েছে। আমরা মনে করি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর তোলা ঢালাও অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে তুলেছে। তিনি এমন কিছু অভিযোগ করেছেন, তার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অন্যদিকে বিরোধী দল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অবস্থানকে ইসলামী ব্যাংক দখলকারী এস আলমকে ফেরানোর চেষ্টা বলে অভিযোগ করেছে।

প্রকৃতপক্ষে ইসলামী ব্যাংকে নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক যথেষ্ট বিচক্ষণতার পরিচয় দিতে পেরেছে, এমনটা বলা যায় না। এ ছাড়া সংসদের প্রথম অধিবেশনে পাস হওয়া ব্যাংক রেজোল্যুশন আইনের ১৮(ক) ধারায় পুরোনো মালিকদের কাছে ব্যাংক ফেরানোর সুযোগের বিষয়টি ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। নানা মহলের উদ্বেগ ও প্রতিবাদের মুখে সরকার ধারাটি সংশোধনের পরিকল্পনা করলেও এখনো তা কার্যকর হয়নি। সবকিছু মিলিয়ে ব্যাংক সংস্কারের ব্যাপারে সরকারের উদ্দেশ্য ও সদিচ্ছা নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।

দশকের পর দশক ধরে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব চলে আসছে। বাণিজ্যিক বিবেচনার চেয়ে দলীয় আনুগত্য প্রাধান্য পাওয়ায় বিভিন্ন ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর অবাধ লুটপাটের ক্ষেত্র হয়ে উঠেছিল ব্যাংক খাত। সরকারি পরিসংখ্যানই বলছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দেশ থেকে ২৩৪ বিলিয়ন ডলার বা ২৮ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়ে গেছে। ডিজিএফআইয়ের সহায়তায় সে সময় এস আলম গ্রুপ ইসলামী ব্যাংক দখল করে নিয়েছিল। বর্তমান সরকারকে এটা মনে রাখতে হবে যে ঋণ পরিশোধের সুযোগ তৈরি করে দেওয়ার নামে ব্যাংক খাতে এস আলমের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার বিষয়টি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হবে না।

দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফেরাতে হলে ব্যাংক খাতকে রাজনৈতিক প্রভাব থেকে বের করে আনা সবচেয়ে বেশি জরুরি। ইসলামী ব্যাংক ঘিরে যে সমস্যা তৈরি হয়েছে, দ্রুত তার সমাধান হওয়া প্রয়োজন। আমরা মনে করি, সংকটটি যেহেতু রাজনৈতিক রূপ পেয়েছে, সেহেতু গভর্নরের উচিত প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলাপ করে সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া। আর এর মূল লক্ষ্য হতে হবে ব্যাংক খাতকে রাজনৈতিক প্রভাব থেকে চূড়ান্তভাবে মুক্ত করা। বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করার বিষয়টিও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। চেয়ারম্যান নিয়োগকে ঘিরে সংকট ও বিতর্কে পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় তাঁর সরে যাওয়ার মধ্য দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার একটা পথ তৈরি হতে পারে।