ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে মাদক ব্যবসার অভিযোগে এক ব্যক্তিকে মা ও স্ত্রীর সামনে নির্যাতনের যে চিত্র সম্প্রতি প্রথম আলোর সংবাদে উঠে এসেছে, তা আইনের শাসন কার্যকর আছে, এমন একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য উদ্বেগজনক। অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে নবীনগর থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে দুটি মামলা আছে বলেও জানা গেছে। অভিযুক্ত ব্যক্তির অপরাধ নির্ধারণের জন্য দেশে আইন ও আদালত আছে। কিন্তু বিচারের প্রাতিষ্ঠানিক পথ এড়িয়ে প্রকাশ্য বাজারে তথাকথিত ‘সালিসের’ নামে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার ঘটনা সামাজিক অবিচারের পথ আরও প্রশস্ত করে দেয়।
মাদকের বিস্তার ও সমাজে এর ক্ষতিকর প্রভাব প্রায়ই সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। মাদকের সহজলভ্যতা ও মাদক ব্যবসা নিয়ে সাধারণ মানুষের ক্ষোভের নিশ্চয়ই যৌক্তিক কারণ আছে। কিন্তু মাদকের বিস্তার রোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যর্থতা ও নিষ্ক্রিয়তার কারণে জনগণের মধ্যে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার যে প্রবণতা তৈরি হয়েছে, তা বিপজ্জনক। কোথাও কোনো এক মাদক ব্যবসায়ীকে ধরে অমানবিকভাবে নির্যাতন করা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়া মাদক সমস্যার কোনো সমাধান নয়। এটা দেশের আইনের শাসনকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়। আমাদের প্রশ্ন, থানায় মামলা থাকা পরও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কেন অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আইনের আওতায় আনতে পারল না?
বলা যায়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা একধরনের দ্বিমুখী সংকট তৈরি করেছে। একদিকে তাদের নিষ্ক্রিয়তা ও তাদের প্রতি অনাস্থা সমাজে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার শর্ত তৈরি করছে, অন্যদিকে অতীতে মাদকবিরোধী অভিযানের নামে রাষ্ট্রীয় বাহিনী কর্তৃক মানবাধিকার লঙ্ঘনেরও নজির রয়েছে। পাশাপাশি মাদক নির্মূলের অজুহাতে প্রায়ই সাধারণ নাগরিকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাও দেখা গেছে।
আমরা জানি, মাদক ব্যবসার একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক অর্থনীতি রয়েছে, যেখানে প্রভাবশালী ব্যক্তি, সিন্ডিকেট এবং একশ্রেণির দুর্নীতিপরায়ণ কর্মকর্তার যোগসাজশ ছাড়া এই শক্তিশালী নেটওয়ার্কের টিকে থাকা অসম্ভব। সম্প্রতি প্রথম আলোর আরেক প্রতিবেদনে দেখা যায়, মাদকের বাহক ধরা পড়লেও, নিয়ন্ত্রক আড়ালেই রয়ে যান। পাশাপাশি মাদক কারবারিদের সঙ্গে পুলিশের কিছু সদস্য যোগাযোগ রেখে চলেন বলেও সেই প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। মাদকের উৎস খোলা রেখে এবং শক্তিশালী সিন্ডিকেট না ভেঙে কেবল খুচরা বিক্রেতাদের গণক্ষোভ বহিঃপ্রকাশের লক্ষ্যবস্তু বানালে মূল সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না।
আমাদের মনে রাখতে হবে, যেকোনো নাগরিককে শাস্তি দেওয়ার একক এখতিয়ার কেবল আদালতের, কোনো ক্ষুব্ধ জনতা বা কথিত স্থানীয় মাদক নির্মূল কমিটির নয়। সরকারের উচিত ওই সালিসের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা। নাগরিকদের জন্য একটি মাদকমুক্ত, সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা যেমন রাষ্ট্রের দায়িত্ব, তেমনি একজন অপরাধীর আইনি অধিকার রক্ষা করাও রাষ্ট্রের কর্তব্য।