প্রথম আলোর খবর জানাচ্ছে, রাশিয়া থেকে সরকারি পর্যায়ে (জিটুজি) পাঁচ লাখ টন গম কেনায় তৃতীয় একটি পক্ষকে যুক্ত করা হয়েছে। গণ খাতে ক্রয় আইন অনুযায়ী সরকারি পর্যায়ে (জিটুজি) ক্রয়প্রক্রিয়ায় বেসরকারি তৃতীয় কোনো পক্ষ থাকার সুযোগ নেই।

অথচ গম ক্রয়ের পুরো প্রক্রিয়াটি মধ্যস্থতা করেছে ন্যাশনাল ইলেকট্রনিক নামে একটি কোম্পানি। আন্তর্জাতিক বাজারে রাশিয়ার গমের শীর্ষস্থানীয় রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত ইউনাইটেড গ্রেন কোম্পানি হলেও বাংলাদেশ চুক্তি করেছে দেশটির প্রডিনটর্ন নামে স্বল্প জনবল নিয়ে চলা একটি কোম্পানির সঙ্গে।

জানা যাচ্ছে, খাদ্য মন্ত্রণালয় আন্তর্জাতিক বাজারের থেকে বেশি ব্যয়ে রাশিয়ার প্রডিনটর্নের সঙ্গে গম কিনতে যাচ্ছে। আগস্টের শেষে যখন চুক্তি সই হয়েছে, সে সময় আন্তর্জাতিক বাজারে গমের দাম প্রতি টন নেমে এসেছে ৩০০ ডলারের কাছাকাছি। জাহাজে পরিবহনের ব্যয় এখন বাড়তি, সে বিবেচনায় আমদানি খরচ কিছুটা বেশি হওয়া যৌক্তিক হলেও খাদ্য মন্ত্রণালয় গম কিনছে প্রতি টন ৪৩০ ডলারে, যা অস্বাভাবিক।

এ ক্ষেত্রে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য, সব বিবেচনায় সবচেয়ে কম দামে গম কেনা হচ্ছে। বিদেশ থেকে সরকারি পর্যায়ে চাল ও গম কেনার ক্ষেত্রে বিশ্ববাজার সম্পর্কে ধারণা পাওয়া ও দরদাম করার জন্য উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বানের নিয়ম মেনে চলা হয়। ১৭ আগস্ট খাদ্য অধিদপ্তর দরপত্র আহ্বান করে, ২৯ আগস্ট সেটি বাতিল করে দেয়।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ১৭ লাখ ৪৪ হাজার টন চাল এবং ১ লাখ ৩৫ হাজার টন গম মজুত রয়েছে। অথচ ভিয়েতনাম ও মিয়ানমার থেকে চাল আমদানির ক্ষেত্রেও সরকার আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়ে বেশি দাম দিতে যাচ্ছে।

সরকারি পর্যায়ে খাদ্য কেনায় এ ধরনের অভিযোগ দেশে নতুন নয়। কিন্তু কোভিড মহামারি এবং ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের অভিঘাতে দেশের অর্থনীতি একটা সংকটকাল পার করছে। জ্বালানি ও ডলার সাশ্রয়ে নানা ধরনের কৃচ্ছ্রসাধনের নীতি গ্রহণ করা হয়েছে।

এ অবস্থায় সবচেয়ে কম দামে খাদ্য কেনার চেষ্টা করা উচিত বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু খাদ্য মন্ত্রণালয়ের কেনাকাটার প্রক্রিয়া ও ধরন দেখে মনে হতে পারে, ‘সরকারি মাল দরিয়াতে ঢাল’ নীতিতে চলছে।

আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়ে বেশি দামে গম আমদানির সিদ্ধান্তকে জনস্বার্থবিরোধী বলে মনে করছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটি মনে করে, একটি অসাধু স্বার্থান্বেষী ও সুযোগসন্ধানী চক্রকে সুপরিকল্পিতভাবে অনৈতিক ও অতি মুনাফা অর্জনের সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে।

এ ছাড়া সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশের পর খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট থেকে দৈনিক খাদ্যশস্য পরিস্থিতির প্রতিবেদন সরিয়ে ফেলা হয়েছে, যা পুরো প্রক্রিয়াকে আরও বেশি প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

প্রশ্ন হচ্ছে আইনের লঙ্ঘন করে ও বেশি দামে খাদ্যশস্য কেনার এই জনস্বার্থবিরোধী চুক্তি কার স্বার্থে? সঠিক প্রক্রিয়া মেনে দরদাম করে কম দামে চাল ও গম আমদানি করতে হবে।

সংকটকে সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করে যারা প্রত্যক্ষ লাভবান এবং পরোক্ষ সুবিধাভোগী; সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে তাদের চিহ্নিত করে জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন।

সম্পাদকীয় থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন