চারটি সিঁড়ি কীভাবে বন্ধ থাকে

সম্পাদকীয়

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ড ও হতাহতের খবর রোগী এবং স্বজনদের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের গাফিলতি ও অব্যবস্থাপনার বড় দৃষ্টান্ত। প্রথম আলোসহ অন্য সংবাদমাধ্যমের খবর থেকে জানা যাচ্ছে, সোমবার বিকেলে ওই অগ্নিকাণ্ডের পর হাসপাতালটির নতুন বহুতল ভবনে থাকা রোগী ও স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। হুড়োহুড়ি করে নামতে গিয়ে হতাহতের ঘটনা ঘটে। নিরাপত্তার অজুহাতে পাঁচটি সিঁড়ির চারটিই বন্ধ থাকায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয় বলে ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন।

প্রাথমিকভাবে মনে করা হচ্ছে, এক সপ্তাহ ধরে বন্ধ থাকা একটি লিফটে শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে। ফায়ার সার্ভিসের চেষ্টায় ৩০ মিনিট পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। স্বজনদের অভিযোগ, আটতলা ভবনটি থেকে নামতে গিয়ে চারজন পদদলিত হয়ে মারা যান। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসন পদদলিত হয়ে মৃত্যুর অভিযোগ অস্বীকার করলেও প্রথম আলো তিনটি পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা দাবি করে, পদদলিত হয়েই তাদের স্বজনেরা মারা গেছেন। আমরা মনে করি, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে এ অভিযোগের নিষ্পত্তি করতে হবে।

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এই অগ্নিকাণ্ড দেশের সব হাসপাতালের জন্যই একটা সতর্কবার্তা। আমাদের জেলা, বিভাগীয় ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতে এমনিতেই ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি রোগী থাকে। এরপর প্রত্যেক রোগীর সঙ্গেই একাধিক স্বজন থাকেন। হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স ও অন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীরা থাকেন। সব মিলিয়ে এ ধরনের একটা জনাকীর্ণ ও সংবেদনশীল স্থাপনা নির্মাণের সময়ই অগ্নিনিরাপত্তাসহ অন্যান্য নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখেই নকশা করতে হয়। হাসপাতালটির নতুন ভবনের ক্ষেত্রেও ৫টি সিঁড়ি ও ১১টি লিফট রয়েছে। তবে অগ্নিকাণ্ডের সময় নিরাপত্তার স্বার্থেই লিফট বন্ধ থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, পাঁচটি সিঁড়ির চারটিই কীভাবে বন্ধ থাকে? আতঙ্কিত রোগী ও স্বজনেরা একটা সিঁড়ি দিয়ে নামার চেষ্টা করায় ভোগান্তি ও হতাহতের ঘটনা বেড়ে যায়।

হাসপাতাল ভবনটিতে শিশু ওয়ার্ড, হৃদ্‌রোগ বিভাগের মতো অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিভাগ রয়েছে। অনেক রোগীর শারীরিক অবস্থা ছিল গুরুতর। রোগীদের স্বজনেরা অগ্নিকাণ্ডের সময়কার যে বিবরণ দিয়েছেন, তাতে এটা বলা যায়, নিছক ভাগ্যের জোরেই শিশু-নারীসহ অনেক মানুষ প্রাণে রক্ষা পেয়েছেন। যে নিরাপত্তার অজুহাতে সিঁড়িগুলো তালাবদ্ধ রাখা হয়েছিল, অগ্নিদুর্ঘটনা ও হতাহতের পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সেগুলো খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমরা মনে করি, সিঁড়িগুলো কারা তালাবদ্ধ রাখার সিদ্ধান্ত দিয়েছিল, তদন্তে সেটা বের করে আনতে হবে ও দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহি করতে হবে।

ময়মনসিংহ মেডিকেলের এই অগ্নিদুর্ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে দেশের হাসপাতালগুলো অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে চিন্তা করা প্রয়োজন। হাসপাতালে অস্ত্রোপচাররত, ভেন্টিলেটরনির্ভর, আইসিইউ-সিসিইউতে থাকা নবজাতক, শিশু, গর্ভবতীসহ নানা ধরনের রোগী থাকেন। অগ্নিকাণ্ডের পর সিঁড়ি দিয়ে তাঁদের নামানো সম্ভব নয়। রোগীদের নিরাপদে সরাতে প্রশিক্ষিত কর্মী, স্ট্রেচার, হুইলচেয়ারসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম প্রয়োজন। আন্তর্জাতিকভাবে বহুতল হাসপাতালে ‘হরাইজন্টাল ইভাকুয়েশন’—অর্থাৎ একই তলার নিরাপদ ফায়ার কম্পার্টমেন্টে রোগীদের সরিয়ে নেওয়াকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। সীমিত জমির কারণে বহুতল হাসপাতাল ভবন এখন বাস্তবতা, সেই বাস্তবতাকে মাথায় রেখেই অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে।

ময়মনসিংহ মেডিকেলের অগ্নিদুর্ঘটনা ও হতাহতের ঘটনা শুধু একটি হাসপাতালের অব্যবস্থাপনার প্রশ্ন নয়, এটি দেশের হাসপাতালগুলোর অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা কতটা প্রস্তুত, সেই বড় প্রশ্ন সামনে এনেছে।