নৌযানশুমারি হোক নৌ নিরাপত্তার ভিত্তি

সম্পাদকীয়

দেরিতে হলেও দেশের নৌযানগুলোর ওপর প্রথমবারের মতো একটি পূর্ণাঙ্গ শুমারি কার্যক্রম হাতে নেওয়ায় সরকার অভিনন্দনের দাবিদার। নদীমাতৃক বাংলাদেশের বাস্তবতায় এ উদ্যোগ কেবল একটি প্রশাসনিক পরিসংখ্যানচর্চা নয়; বরং এটি রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গির একটি মৌলিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে। এত দিন যে খাতটি ছিল প্রায় অদৃশ্য, অসংগঠিত ও অনিয়ন্ত্রিত, তাকে প্রথমবারের মতো গণনায় আনার প্রয়াস নিঃসন্দেহে এক গুরুত্বপূর্ণ সূচনা।

প্রথম নৌশুমারির প্রাথমিক ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, দেশের নদ-নদীতে ইঞ্জিনচালিত নৌযানের সংখ্যা ২ লাখ ৪৪ হাজারের বেশি অর্থাৎ আড়াই লাখের কাছাকাছি। অথচ নিবন্ধিত নৌযান রয়েছে মাত্র ২০ হাজারের কিছু বেশি। পরিসংখ্যানের এই অমিল কেবল একটি সংখ্যাগত ব্যবধান নয়; এটি যেন রাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের অবহেলার এক নীরব ব্যঙ্গচিত্র—নদীতে বাস্তবতা এক, কাগজে আরেক। যেন নদীপথে চলমান নৌযানগুলোর অধিকাংশই রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক দৃষ্টির বাইরে একপ্রকার ‘অদৃশ্য যান’ হয়ে ভেসে বেড়াচ্ছিল।

বাংলাদেশে সড়কপথের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ, পণ্য পরিবহনের ব্যয়বৃদ্ধি এবং উপকূল, হাওর ও চরাঞ্চলের জনগোষ্ঠীর বিচ্ছিন্নতা—এই তিন বাস্তবতার সম্মিলিত প্রেক্ষাপটে নৌপথের বিকল্প অতি সীমিত। বরং নৌপথই হতে পারে একটি সাশ্রয়ী, পরিবেশসম্মত ও টেকসই যোগাযোগব্যবস্থার ভিত্তি। কিন্তু সেই নৌপথ যদি থাকে নিরাপত্তাহীন, অনিয়ন্ত্রিত ও বিশৃঙ্খল, তবে তাকে আর উন্নয়নের প্রতীক নয়; বরং বিপর্যয়ের পূর্বাভাস বলা যেতে পারে।

এ প্রেক্ষাপটে স্বাধীনতার পর প্রথম নৌশুমারি নিছক একটি তথ্য সংগ্রহ কার্যক্রম নয়; এটি হতে পারে নৌ নিরাপত্তার ভিত্তিপ্রস্তর। কারণ, রাষ্ট্র এখন প্রথমবারের মতো অনুধাবন করতে পারছে—বাস্তবিক অর্থে কত নৌযান দেশের নদ-নদীতে চলমান। এ জ্ঞানই নিয়ন্ত্রণের পূর্বশর্ত, আর নিয়ন্ত্রণই নিরাপত্তার প্রারম্ভিক শর্ত।

তবে শঙ্কার বিষয় এই যে যদি এই বিপুল তথ্যভান্ডার কেবল ডেটাবেজের নিস্তব্ধতায় আবদ্ধ থাকে, তবে তার কোনো বাস্তব ফলপ্রসূতা থাকবে না। পরিসংখ্যান তখন কেবল সংখ্যার অলংকার হয়ে থাকবে, জননিরাপত্তার রক্ষাকবচ হয়ে উঠবে না। ফলে প্রতিটি নৌযানকে নিবন্ধন, সার্ভে, ফিটনেস সার্টিফিকেট, চালকের যোগ্যতা ও প্রশিক্ষণ, রুট পারমিট এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সরঞ্জামের সঙ্গে আবদ্ধ করা অপরিহার্য।

বিশেষত বাল্কহেড, ড্রেজার, স্পিডবোট ও যাত্রীবাহী নৌযানের ক্ষেত্রে ঝুঁকিভিত্তিক নজরদারি প্রতিষ্ঠা সময়ের দাবি। এদের গতি, আকার ও ব্যবহারগত বৈচিত্র্য নৌপথে বহুমাত্রিক ঝুঁকি সৃষ্টি করে; ফলে একটি সমন্বিত ও বিজ্ঞানভিত্তিক তদারকি কাঠামো ছাড়া নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অসম্ভব।

এখানে আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো অর্থনৈতিক। দেশের বিপুলসংখ্যক অনিবন্ধিত নৌযানকে নিবন্ধনের আওতায় আনা গেলে রাষ্ট্রের রাজস্ব আয়ও বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা। নিবন্ধনের মাধ্যমে নৌযানগুলোকে আইনি কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত করা গেলে সেগুলোর নিয়মিত পরিদর্শন, ফিটনেস যাচাই এবং চালকদের যোগ্যতা ও প্রশিক্ষণের মান নিশ্চিত করা সহজতর হবে।

তবে এই নিবন্ধন কার্যক্রম ঘিরে কোনো ধরনের দুর্নীতি, অনিয়ম বা অতিরিক্ত আর্থিক হয়রানি যাতে দানা বাঁধতে না পারে, সে বিষয়ে সরকারকে শুরু থেকেই কঠোর, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ডিজিটাল নিবন্ধনপ্রক্রিয়া, নির্ধারিত ফি-কাঠামোর কঠোর প্রয়োগ, তৃতীয় পক্ষের অডিট এবং কার্যকর অভিযোগ নিষ্পত্তিব্যবস্থা প্রবর্তনের মাধ্যমে এ প্রক্রিয়াকে জনগণের আস্থার ভিতের ওপর প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। অন্যথায় যে উদ্যোগ নৌ খাতকে শৃঙ্খলার পথে আনতে পারে, সেটিই আবার অনিয়মের নতুন ক্ষেত্র হয়ে ওঠার ঝুঁকি বহন করবে।

অনিবন্ধিত নৌযানগুলোর সঠিক সংখ্যা নিরূপণ এবং সেগুলোকে নিবন্ধনের আওতায় আনা একটি প্রাথমিক ও জরুরি পদক্ষেপ। এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই একটি সুশৃঙ্খল, নিরাপদ ও দক্ষ নৌপরিবহনব্যবস্থার ভিত রচিত হতে পারে।