১১টি সিটি করপোরেশনের পর দেশের ৪২টি জেলা পরিষদে রাজনৈতিক প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের কেউ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির পক্ষে অংশ নিয়ে পরাজিত হয়েছিলেন, আবার কেউ দলটির মনোনয়নবঞ্চিত ছিলেন। ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ আমলে জেলা পরিষদ হয়ে উঠেছিল দলীয় নেতাদের পুনর্বাসন কেন্দ্র। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বিশেষ পরিস্থিতিতে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। নতুন সরকারের আমলে স্থানীয় সরকারে রাজনৈতিক নিয়োগ দেখা যাওয়ায় নাগরিকদের মধ্যে সংশয় ও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বিরোধী দলগুলোও এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদসহ বিভিন্ন স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অপসারণ করা হয়। এ ছাড়া অনেক জনপ্রতিনিধি পালিয়ে যান। এর ফলে স্থানীয় সরকারব্যবস্থায় শূন্যতা তৈরি হয়েছিল। তখন প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সরকারি কর্মকর্তাদের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রশাসক হিসেবে অস্থায়ীভাবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করাটাই ছিল সবচেয়ে যৌক্তিক সমাধান। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে স্থানীয় সরকার নির্বাচন করা যায়নি। সে সময় স্থানীয় সরকারে প্রশাসক নিয়োগ করা হয়েছিল বিশেষ পরিস্থিতিতে; কিন্তু সেই সাময়িক ব্যবস্থা দীর্ঘায়িত হওয়ায় নাগরিক সেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
বাস্তবতা হলো সরকারি কর্মকর্তারা নিজ নিজ দাপ্তরিক কাজ সামলাতেই হিমশিম খান। ফলে নগর পরিচালনায় জটিল ও প্রতিদিনের সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনীয় সময়, মনোযোগ ও রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা দৃশ্যমান হচ্ছে না। এতে নগরবাসী ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। ভাঙাচোরা রাস্তা মেরামত, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা, মশা নিয়ন্ত্রণ, জন্মনিবন্ধনসহ বিভিন্ন সনদ প্রদান—সবই ঢিমেতালে চলছিল।
এমন প্রেক্ষাপটে নতুন সরকার আমলাদের পরিবর্তে দলীয় নেতাদের প্রশাসক বসানো শুরু করেছে। সরকারের নীতিনির্ধারকেরা হয়তো প্রত্যাশা করছেন, রাজনৈতিকভাবে দক্ষ ব্যক্তিরা নগর পরিচালনায় গতি আনবেন। তবে স্থানীয় সরকারবিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এভাবে রাজনৈতিক প্রশাসক নিয়োগের কারণে স্থানীয় সরকারে দলীয়করণ আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেতে পারে। এতে স্থানীয় সরকারের ওপর সরকারি দলের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ঝুঁকি তৈরি হয়।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আইন পাল্টে নির্দলীয় থেকে দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন চালু করা হয়েছিল। এতে দলীয়করণের পাশাপাশি স্থানীয় সরকারব্যবস্থাটি তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য হারায়। নাগরিকেরা প্রত্যাশা করেন স্থানীয় সরকারব্যবস্থাকে তার স্বমহিমায় ফিরিয়ে আনা হবে।
গণতন্ত্রের মৌলিক ভিত্তি হলো জনপ্রতিনিধিত্ব। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা নাগরিকদের সেবা নিশ্চিত করতে পারেন। আমরা মনে করি, স্থানীয় সরকারে রাজনৈতিক প্রশাসক নিয়োগ করায় নাগরিকদের কাছে ভুল বার্তা যাচ্ছে।
বিএনপি সরকারের এ সিদ্ধান্ত দলটির নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। কেননা বিএনপি স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, ‘স্থানীয় সরকার থেকে জাতীয় সংসদ পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে জনগণের সরাসরি ভোটে প্রতিনিধি নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্র ও সরকারে জনগণের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করা হবে।’
আমরা মনে করি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের সাবেক অধ্যাপক সালাহউদ্দিন এম আমিনুজ্জামান যথার্থই বলেছেন, নির্বাচিত সরকারের আমলে স্থানীয় নির্বাচনের উদ্যোগ না নিয়ে প্রশাসক নিয়োগের মাধ্যমে একধরনের ব্যত্যয় হলো। এ ক্ষেত্রে দ্রুত, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনই একমাত্র টেকসই সমাধান। স্থানীয় সরকারে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনা মানে শুধু ভোটের আয়োজন নয়; বরং জবাবদিহিমূলক, কার্যকর ও নাগরিকমুখী নগর শাসন প্রতিষ্ঠা করা।
প্রশাসক নিয়োগ নয়, স্থানীয় সরকারে দ্রুত নির্বাচনের উদ্যোগ নেওয়াটাই সরকারের করণীয় হওয়া উচিত।