অটুট থাকুক আবহমান সম্প্রীতি

সম্পাদকীয়

আজ শুভ বিজয়া দশমী। প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে পর্দা নামছে বাঙালি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গোৎসবের। দুর্গাপূজা হিন্দু সম্প্রদায়ের শত শত বছরের ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় উৎসব হলেও বাংলাদেশে এটি আবহমানকাল ধরে সর্বজনীন সামাজিক রূপ লাভ করে এসেছে। দুর্গোৎসবের প্রধানত দুটি দিক—একটি ধর্মীয় আচার, অন্যটি সামাজিক মিলনমেলা। ধর্মীয় পূজা-অর্চনার বিষয়টি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের নিজস্ব হলেও এর সামাজিক আনন্দ, মেলা ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ সব ধর্মের মানুষের জন্য অবারিত। প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে আচারের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে ঠিকই, কিন্তু শুভশক্তির জয় এবং অশুভর বিনাশের যে সর্বজনীন চেতনা এটি বয়ে আনে, তা নাগরিক সমাজমানসে চিরন্তন হয়ে থাকে।

পৌরাণিক কাহিনি অনুযায়ী, ‘দুর্গম’ নামক অসুরের তাণ্ডবে বিপর্যস্ত জীবজগৎ ও দেবকুলের দুর্গতি দূর করতেই দেবী দুর্গার আবির্ভাব হয়েছিল। ‘কৃত্তিবাসী রামায়ণ’–এ উল্লেখিত শরৎকালের অকালবোধনের পর থেকেই এটি শারদীয় দুর্গোৎসব হিসেবে স্বীকৃত। বাঙালি হিন্দুমানসে দেবী দুর্গা কেবল আরাধনার কোনো প্রতীক নন; তিনি একাধারে অন্যায়ের বিনাশকারী ‘শক্তিরূপা’ এবং জীবের আশ্রয়স্থল পরম মমতাময়ী ‘মাতৃরূপা’। একাধারে অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রতীক এবং অন্যদিকে সৌন্দর্য ও সৃষ্টির আধার—শক্তি ও মমতার এই মেলবন্ধন মানুষকে শেখায় অসত্যের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে এবং অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে।

উৎসবের সামাজিক ও অর্থনৈতিক তাৎপর্যও সুদূরপ্রসারী। পূজা উপলক্ষে নতুন পোশাক কেনাকাটা, মেলার আয়োজন ও পর্যটন খাতের গতিশীলতা দেশের অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখে। তবে দুর্গোৎসবের মূল সৌন্দর্য ফুটে ওঠে একটি ভয়হীন ও নিরাপদ পরিবেশে। প্রতিবছরের মতো এ বছরও সারা দেশে উৎসাহ-উদ্দীপনা ও সম্প্রীতিময় পরিবেশে দুর্গোৎসব উদ্‌যাপিত হচ্ছে। সারা দেশে মোট ৩৩ হাজার ৮৫১টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এ বছর মণ্ডপের সংখ্যা গত বছরের তুলনায় প্রায় দেড় হাজার বেশি। পূজাকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপর আছে। কয়েক বছরের ধারাবাহিকতায় পূজাকে কেন্দ্র করে এবারও বড় কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। আমরা আশা করি, এই শান্তি ও সম্প্রীতিময় পরিবেশ অটুট থাকবে।

জাতীয় মন্দির ঢাকেশ্বরীসহ দেশের বিভিন্ন পূজামণ্ডপে সরকার ও বিরোধীদলীয় রাজনৈতিক নেতারা অসাম্প্রদায়িক মূল্যবোধ পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তাঁরা স্পষ্ট করেছেন, নাগরিক অধিকারে সংখ্যাগুরু বা সংখ্যালঘু বলে কোনো বিভাজন বা বৈষম্য থাকতে পারে না। এটিই বাংলাদেশের আবহমান ইতিহাস ও ঐক্যের মূল ভিত্তি। বিজয়া দশমীর এই মাহেন্দ্রক্ষণে প্রতিমা বিসর্জনের সঙ্গে সঙ্গে সমাজ থেকে যাবতীয় বৈষম্য, হিংসা ও ধর্মীয় সংকীর্ণতা বিসর্জিত হোক। শুভশক্তির জয় হোক এবং সম্প্রীতির বন্ধন অটুট থাকুক—এই আমাদের আশাবাদ। সবাইকে বিজয়া দশমীর শুভেচ্ছা। শুভশক্তির জয় হোক; শান্তি ও সম্প্রীতির ঐতিহ্য অটুট থাক।