সরকারি অর্থের অপচয় বন্ধ করা হোক

সম্পাদকীয়

ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) নিয়ে জন–আস্থার সংকট এবং রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজের বিরোধিতা থাকা সত্ত্বেও ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে দেড় লাখ মেশিন কেনা হয়েছিল। প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা দিয়ে কেনা সেই ইভিএম এখন নির্বাচন কমিশনের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় ইভিএমগুলো একদিকে অকেজো হয়ে পড়েছে, অন্যদিকে সংরক্ষণের জন্য গুদামভাড়া বাবদ মাসে এক কোটি টাকার বেশি গচ্চা যাচ্ছে। সরকারি অর্থ এভাবে অপচয়ের পেছনে কী যুক্তি থাকতে পারে, সেটা কোনোভাবেই বোধগম্য নয়।

চব্বিশের অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শুধু নির্বাচনব্যবস্থাকে নির্বাসনেই পাঠানো হয়নি; বরং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটিকে দুর্নীতির বড় উৎসস্থলে পরিণত করা হয়েছিল। এ কে এম নূরুল হুদা কমিশনের ইভিএম কেনার প্রকল্পটি তার একটা উদাহরণ হতে পারে। একেকটা ইভিএম যন্ত্র কিনতে ব্যয় হয়েছিল প্রায় ২ লাখ ৩৫ হাজার টাকা, যা ভারতের তুলনায় ১১ গুণ বেশি। অথচ ‘রাতের ভোট’ হিসেবে পরিচিত ২০১৮ সালের নির্বাচনে মাত্র ৬টি আসনে পরীক্ষামূলকভাবে ইভিএম ব্যবহার করা হয়েছিল।

বাংলাদেশে প্রথম ইভিএম মেশিনে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয় ২০১১ সালে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের একটি ওয়ার্ডে। ২০১৩ সালে রাজশাহী সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ইভিএমে সমস্যা ধরা পড়ে। ফলে শুরু থেকেই ইভিএম মেশিনে নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গঠিত নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে তাদের প্রতিবেদনে নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার না করার সুপারিশ করেছিল। নির্বাচন কমিশন আরপিও সংশোধন করে ইভিএম ব্যবহারের অংশ বাদ দিয়েছে।

নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ের বরাতে প্রথম আলো জানাচ্ছে, দেড় লাখ ইভিএম মেশিন কেনার সময় এগুলো কোথায় রাখা হবে, সে ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি, এ জন্য কোনো অর্থও বরাদ্দ করা হয়নি। ৭০ হাজার ইভিএম মাঠপর্যায়ের ৪১ জেলায় বেসরকারি গুদামে রাখা হয়েছে; যেখানে প্রতি মাসে ৩৩ লাখ টাকা করে ভাড়া দিতে হচ্ছে। বাকি ৮০ হাজার ইভিএম যন্ত্র বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরির (বিএমটিএফ) আধুনিক ওয়্যারহাউসে সংরক্ষিত আছে। পাঁচ বছরে ভাড়া বাবদ বকেয়া জমেছে প্রায় ৭২ কোটি টাকা।

ইভিএম কেনাকাটায় দুর্নীতির অভিযোগ দুদকে তদন্তাধীন থাকায় ইভিএম যন্ত্রগুলো নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না নির্বাচন কমিশন। প্রশ্ন হচ্ছে, তদন্ত শেষ হওয়ার আগপর্যন্ত সব ইভিএম যন্ত্রই সংরক্ষণ করা প্রয়োজন কি না। নির্বাচন কমিশনকে ইভিএমগুলোর জন্য আর কত ভাড়া গুনতে হবে। মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় ইভিএমগুলো পুড়িয়ে ফেলতে চায় ইসি। তবে ইভিএমে ব্যবহৃত ব্যাটারি, সার্কিট চিফ, মেমোরি চিপের মতো যন্ত্রাংশ পোড়ালে বায়ুদূষণ হবে আর যত্রতত্র ফেললে মাটিদূষণ হবে। সে ক্ষেত্রে ইভিএমগুলো অন্য কোনো কাজে ব্যবহার করা যায় কি না, সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে সেটা ভেবে দেখা প্রয়োজন।

সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে, এত উচ্চমূল্যে নিম্নমানের ইভিএম কেনাকাটার সঙ্গে যাঁরা জড়িত ছিলেন, তাঁদের সবাইকে আইনের আওতায় আনা জরুরি। ভবিষ্যতে যাতে জনগণের অর্থের এমন অপচয় না হয় এবং দুর্নীতির সুযোগ বন্ধ করা হয়, তার জন্যই জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।