রাজশাহীর বাঘা, চারঘাট, পবা, মোহনপুর ও তানোর উপজেলার গ্রামগুলোতে ঋণের জালে পিষ্ট হওয়া মানুষের যে হাহাকার উঠছে, তা ক্ষুদ্রঋণ বিতরণে অব্যবস্থাপনা এবং ঋণসুবিধার অপব্যবহারকে আবারও সামনে এনেছে। ব্যবসা বা কৃষির জন্য ছাড়াও ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্যও মানুষ ঋণ নিচ্ছে। ঋণ শোধ করতে না পেরে মাত্র পাঁচ মাসে আটজনের অপমৃত্যু ঘটেছে। বহু মানুষের গ্রাম ছেড়ে আত্মগোপনে চলে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। বিষয়টি সত্যিই উদ্বেগজনক।
আমাদের দেশের ক্ষুদ্রঋণ প্রদানকারী সংস্থাগুলোর প্রধান উদ্দেশ্য হওয়ার কথা ছিল দারিদ্র্য বিমোচন ও স্বাবলম্বিতা। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। সংস্থাগুলোর তথাকথিত ‘টার্গেট’ বা লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে গিয়ে মাঠকর্মীরা গ্রাহকের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা যাচাই না করেই ঋণ দিচ্ছেন। একজন ব্যক্তি ইতিপূর্বে কয়টি সংস্থা থেকে ঋণ নিয়েছেন, তা দেখার প্রয়োজন মনে করছেন না কেউ। ফলে এক ঋণের কিস্তি শোধ করতে মানুষ অন্য সংস্থা থেকে পুনরায় ঋণ নিচ্ছেন। এই ‘ঋণের ওপর ঋণের’ ভার সইতে না পেরে আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছেন মানুষ। যাঁদের কেউ কৃষক, কেউ অটোরিকশাচালক। আত্মহত্যার আগে কেউ চিরকুটে লিখে বলে যাচ্ছে, ‘সুদ দিয়ো না, কিস্তি দিয়ো না।’
এখানে প্রশ্ন জাগে, ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোর (সিআইবি) মতো তথ্যভান্ডার কেন এখনো ক্ষুদ্রঋণের ক্ষেত্রে পুরোপুরি কার্যকর নয়। গ্রাহকের জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে যদি সহজেই যাচাই করা যেত যে তিনি কয়টি এনজিও থেকে ঋণ নিয়েছেন, তবে সম্ভবত এই আত্মঘাতী ঋণের চক্রটি শুরুতেই থামানো যেত। এনজিও কর্মকর্তাদের তাড়াহুড়া আর গ্রাহকদের তথ্য গোপনের সুযোগে একটি ভয়াবহ বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে, যার চূড়ান্ত মূল্য দিচ্ছে জীবন দিয়ে।
সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, কৃষকেরা যখন ফসল উৎপাদনের জন্য ঋণ নেন, তখন প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা বাজারমূল্য কমে যাওয়ার ঝুঁকিটি কেবল তাঁদের একার কাঁধেই পড়ে। পেঁয়াজ বা পানের দাম না পেয়ে সর্বস্বান্ত হওয়ার পর যখন পাওনাদারদের কিস্তির চাপ শুরু হয়, তখন রাষ্ট্রের বা সংস্থার পক্ষ থেকে কোনো আইনি বা সামাজিক সুরক্ষা তাঁরা পান না। অথচ দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা মানুষের জন্য ন্যূনতম জীবনমানের নিশ্চয়তা থাকা সমাজের অন্যতম প্রধান শর্ত।
আমরা মনে করি, কেবল মুনাফা আর লক্ষ্য পূরণের জন্য নয়, বরং মানবিক মূল্যবোধকে গুরুত্ব দিয়ে ক্ষুদ্রঋণ ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো এখন সময়ের দাবি। অবিলম্বে কেন্দ্রীয়ভাবে ঋণের তথ্য যাচাইয়ের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি দুর্যোগ বা লোকসানের মুখে থাকা কৃষকদের কিস্তি আদায়ে নমনীয়তা এবং প্রয়োজনীয় পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। ঋণ পরিশোধের চাপে পড়ে আমরা আর কোনো মৃত্যু চাই না।