পাচারকারীরা কেন শাস্তি পায় না

সম্পাদকীয়

মানব পাচারের ফাঁদ পাতা পৃথিবীজুড়েই। আর পাচারকারীরা লক্ষ্যবস্তু করে অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠীকে। করোনাকালে দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেড়েছে এবং অনেকেই কর্মসংস্থান হারিয়েছেন—এ কথা অস্বীকার করা যাবে না। এই সুযোগই কাজে লাগিয়ে থাকে মানব পাচারকারী চক্র।

গত সপ্তাহে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার সময় টেকনাফ উপকূলে ট্রলারডুবিতে যাঁরা মারা গেছেন ও উদ্ধার হয়েছেন, তাঁরা রোহিঙ্গা শরণার্থী। তবে এ কথা ভাবার কারণ নেই যে বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গারাই কেবল পাচার হয়। এর আগে র‍্যাবের হাতে ধরা পড়া চার পাচারকারী যাঁদের পাচার করেছিল, তাঁরা বাংলাদেশেরই নাগরিক। যতই দিন যাচ্ছে, বাড়ছে মানব পাচার।

মাদক নিয়ন্ত্রণ ও অপরাধ প্রতিরোধে কাজ করা জাতিসংঘের সংস্থা ইউএনওডিসি, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত প্রথম জাতীয় মানব পাচারবিষয়ক গবেষণায় দেখা যায়, মানব পাচারের শিকার মানুষের বেশির ভাগই অত্যন্ত গরিব এবং জীবিকার তাগিদে এ পথে পা দেন। বিশেষ করে পাচারকারীরা রংপুর অঞ্চলের পাঁচ জেলা; বান্দরবান, কিশোরগঞ্জ, মাগুরা ও জামালপুর জেলার বাসিন্দাদের লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে বিদেশে পাচার করে থাকেন।

বৈধভাবে বিদেশে যেতে অনেক অর্থ খরচ করতে হয়। পাচারকারীরা দরিদ্র মানুষকে কোনো টাকাপয়সা ছাড়াই বিদেশে নিয়ে যায় চাকরি দেওয়ার নাম করে। এর আগে ইউএনওডিসির ২০২০ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ৫১ শতাংশ মানুষ জীবিকার প্রয়োজনে পাচারকারীদের ফাঁদে পা দেন। বাংলাদেশ থেকে যেসব দেশে বেশি মানুষ পাচার হয়, সেগুলো হলো পূর্ব আফ্রিকা, উত্তর আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশ। পাচার হওয়া মানুষগুলো সেখানে কেবল দুর্বিষহ জীবনযাপন করতে বাধ্য হন তা-ই নয়, অনেকে জিম্মিও হয়ে পড়েন। দেশে থাকা স্বজনদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায় করে থাকে পাচারকারীরা। তারা মেয়েদের যৌনকর্মী হিসেবে কাজ করতে বাধ্য করে।

বাংলাদেশ থেকে মানব পাচারের কারণ ও ঝুঁকি চিহ্নিত করার পাশাপাশি ওই প্রতিবেদনে কিছু সুপারিশও করা হয়েছে, যার মধ্যে আছে অপরাধ দমনে শক্তিশালী প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তোলা, ভুক্তভোগীদের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা, মানব পাচার ও জোর করে শ্রম বন্ধ করতে কৌশলপত্র প্রণয়ন। গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানও মানব পাচারকে বড় সমস্যা হিসেবে স্বীকার করে মানব পাচারে সক্রিয় দালাল চক্র প্রতিরোধ করার তাগিদ দিয়েছেন।

পাচার রোধে বক্তৃতা-বিবৃতি, গবেষণাই যথেষ্ট নয়। সরকারকে দ্বিমুখী কার্যক্রম জারি রাখতে হবে। এক. যাতে পাচার না হতে পারে সে জন্য সীমান্তে কঠোর পাহারা, দুই. পাচারকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া। দুর্ভাগ্য, বাংলাদেশে মানব পাচারবিরোধী কঠোর আইন থাকলেও তার যথাযথ প্রয়োগ নেই।

মানব পাচারের মতো ঘৃণ্য অপরাধ প্রতিরোধের দায়িত্ব মূলত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। বিমান, নৌপথ কিংবা সড়কপথে যাতে কেউ পাচার করতে না পরে, সে জন্য সীমান্তরক্ষীদের সদাসতর্ক থাকতে হবে। আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। সেই সঙ্গে মানব পাচারের বিরুদ্ধে গড়ে তুলতে হবে সামাজিক সচেতনতাও। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, মানব পাচারের ঘটনায় আসামি ধরা পড়লেও বিচার হয় না। শাস্তি পায় না। আমরা যদি পাচারকারীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে না পারি, মানব পাচার চলতেই থাকবে।