জনগণের ঘাড়ে দোষ না চাপিয়ে দায়িত্ব নিন

সম্পাদকীয়

এ বছর ডেঙ্গু সংক্রমণ ও মৃত্যুর যে ভয়াবহ রূঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি দেশের মানুষ হলেন, তার দায় কি তাঁদের নিজেদেরই? কোনো যুক্তিতে তা না হলেও সরকারের দায়িত্বশীলদের তরফ থেকে এ বক্তব্য প্রায়ই শুনতে হয়। ২০০০ সাল থেকে দেশে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর তথ্য সংরক্ষণ শুরু হয়। ২০২২ সালে সর্বোচ্চ ২৮১ জন মারা যান এডিস মশাবাহিত এ রোগে।

কিন্তু এ বছরের অক্টোবর মাস পর্যন্ত ১ হাজার ৩০০-এর বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এই পরিসংখ্যানই কি এটা বলার জন্য যথেষ্ট নয় যে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, সিটি করপোরেশন এবং রোগ নিরাময়ের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে ব্যর্থতা কতটা সীমাহীন।

ডেঙ্গুর সংক্রমণ যে এ বছর ভয়াবহ অবস্থায় পৌঁছাতে যাচ্ছে, কীটতত্ত্ববিদেরা তার সতর্কতা বছরের শুরু থেকেই করে আসছিলেন। বর্ষা মৌসুমের আগে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জরিপেই ঢাকার প্রায় সব এলাকায় এডিস মশার লার্ভার ঘনত্ব বেশি পাওয়া যাচ্ছিল। কিন্তু তাঁদের সেই সতর্কবার্তাকে আগেভাগে আমলে নেওয়ার প্রয়োজন মনে করেনি কেউই। বিশ্বের সবচেয়ে বসবাস অনুপযোগী শহর ঢাকায় জনঘনত্বের দিক থেকেও প্রথম। এডিস মশার বংশবিস্তারের এ রকম আদর্শ পরিবেশের কারণে ঢাকার বাসিন্দারা ডেঙ্গু বোমার ওপর বাস করেন। এখান থেকে ডেঙ্গু সারা দেশেই ছড়িয়ে পড়ে।

ডেঙ্গু সংক্রমণের অভিজ্ঞতা ২৩ বছর হলেও মোকাবিলার ক্ষেত্রে প্রতিবছর আমাদের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষকে মনে হয় তারা এবারই নতুন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হলো। দায়িত্বপ্রাপ্তদের দায়সারা কাজ, আত্মতুষ্টি, স্থানীয় সরকার ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মধ্যকার সমন্বয়হীনতার কারণেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলেও তারা তাদের ব্যর্থতার দায় চাপিয়ে দিয়েছে ভুক্তভোগী মানুষের ওপর।

এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম এবং ডেঙ্গু চিকিৎসাপদ্ধতি নিয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের গবেষণায় উঠে এসেছে এ বছর ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সরকারি ও রাজনৈতিক উদ্যোগ প্রাধান্য পায়নি। পূর্বসতর্কতা থাকার পরও লোকদেখানো মশকনিধন কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে। কোভিড-সংকট মোকাবিলায় যে অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়েছিল, সেটাকেও কাজে লাগানো হয়নি। আইনে ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে সুস্পষ্টভাবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালনের কথা থাকলেও তাদের কার্যক্রম রোগনির্ণয় ও চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর সীমাবদ্ধ।

মশকনিধন কার্যক্রম এবং চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা—দুই ক্ষেত্রেই ব্যর্থতার কারণে বাংলাদেশ এ বছর ডেঙ্গু সংক্রমণ ও মৃত্যুর দিক থেকে বিশ্বে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে। এতগুলো বছরেও সরকার কেন ডেঙ্গু মোকাবিলার একটি সফল পদ্ধতি গ্রহণ করতে পারল না? গত ১১ বছরে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন মশকনিধনে প্রায় ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা ব্যয় করেছে। কিন্তু তাতে কোনো লাভ হয়নি, তা বলা বাহুল্য।

স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার দিকটা বিবেচনা করলে আমরা দেখতে পাই, এ বছরের জুন মাসে সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি বিবেচনায় জনস্বাস্থ্য জরুরি পরিস্থিতি ঘোষণার কথা বলেছিলেন জনস্বাস্থ্যবিদেরা। কিন্তু সেটা আমলে নেওয়া হয়নি। ফলে ভয়াবহ ভোগান্তি ও বিশাল অঙ্কের চিকিৎসা ব্যয়ের বোঝা বইতে হয়েছে নাগরিকদের। অনেক পরিবারকে তাদের সন্তান হারাতে হয়েছে। কিন্তু সেই শোকে অন্তত সমবেদনাটুকু নিয়েও পাশে দাঁড়ানোর প্রয়োজনীয়তা বোধ করেনি দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ।

অভিজ্ঞতা থেকে মানুষ শিক্ষা নেয়, যাতে করে ভবিষ্যতের দুর্যোগ সফলভাবে মোকাবিলা করতে পারে। কিন্তু আত্মতুষ্টি, বাগাড়ম্বর, প্রদর্শন প্রবণতা, দায় চাপানোর বৃত্ত থেকে বেরিয়ে না এলে অভিজ্ঞতা যে কিছু শেখাতে পারে না, ডেঙ্গু তার বড় একটি উদাহরণ। জনগণের ঘাড়ে দায় না চাপিয়ে দায়টা নেওয়ার মতো চওড়া কাঁধ আমাদের দায়িত্বশীলদের কবে হবে? বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পথনির্দেশনা মেনে সারা বছর ডেঙ্গু মোকাবিলায় কার্যক্রম গ্রহণ করুন। মানুষের জীবন রক্ষায় সারা বছর ধরে মশকনিধনে পদক্ষেপ নিন।