নারী ও পুরুষের সমতার বিশ্ব গড়ার পথে একটি বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বৈষম্যমূলক আইন। দুঃখজনক হলেও সত্যি, একবিংশ শতকের দ্বিতীয় দশকে এসেও বিশ্বের কোনো দেশই আইনের নিরিখে নারী ও পুরুষের মধ্যকার বৈষম্য দূর করতে পারেনি। এ বাস্তবতার মধ্যেই এবার ‘অধিকার, ন্যায়বিচার ও পদক্ষেপ: সকল নারী ও মেয়েদের জন্য’ প্রতিপাদ্যে আজ ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালিত হচ্ছে। এই প্রতিপাদ্যের মধ্য দিয়ে জাতিসংঘ স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে যে নারীর অধিকার ও ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠায় আইনি ও বিচারিক বৈষম্য ও বাধা কাটিয়ে ওঠার ক্ষেত্রে জোরালো পদক্ষেপ নেওয়াটা কতটা জরুরি কর্তব্য।
জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের সর্বশেষ প্রতিবেদন বলছে, বৈষম্যমূলক আইনকাঠামোর কারণে বিশ্বব্যাপী পুরুষদের আইনগত অধিকারের মাত্র ৬৪ শতাংশ ভোগ করে নারী। এর অর্থ হলো কাজ, অর্থ, নিরাপত্তা, সম্পদ, ব্যবসা সব ক্ষেত্রেই বিভিন্ন দেশের প্রচলিত আইন নারীদের প্রতি কতটা বৈরী। বাস্তবতা হলো, বর্তমানে যে গতিতে সংস্কার চলছে, তাতে নারী ও পুরুষের আইনি অসমতা কাটিয়ে উঠতে ২৮৬ বছর লেগে যাবে। ফলে নারী–পুরুষের বৈষম্য কমাতে হলে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন পদক্ষেপ।
নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার মাত্রা বেড়ে যাওয়া এবং নারীর পরিসর সংকুচিত হওয়ার বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য এবারের নারী দিবসের প্রতিপাদ্য আরও বেশি প্রাসঙ্গিক ও তাৎপর্যপূর্ণ বলেই আমরা মনে করি। মানবাধিকার সংস্থা ও নারী অধিকার সংস্থাগুলোর সাম্প্রতিক সব প্রতিবেদনই সাক্ষ্য দিচ্ছে, নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা মাত্রা ও পরিমাণে কতটা ভয়াবহভাবে বেড়েছে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালে ধর্ষণ বা দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৫১৬ জন, যার ২৭০টিই শিশু। ২০২৫ সালে ধর্ষণ ও দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৭৮৬ জন, যার মধ্য ৫৪৩টি শিশু। শুধু ধর্ষণ নয়, অন্যান্য সহিংসতাও উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। ২০২৫ সালে মোট নথিভুক্ত মামলার মধ্যে প্রায় ২২ হাজার মামলাই ছিল নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা।
শুধু বাস্তবের সামাজিক ও পারিবারিক পরিসর নয়, জনপরিসর ও ডিজিটাল পরিসরেও নারীর প্রতি সহিংসতা বেড়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে কোনো কোনো অতি ক্ষমতায়িত গোষ্ঠী নারীদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যেই ঘৃণামূলক বক্তব্য দিয়েছে এবং অনলাইনে সংঘবদ্ধভাবে বিদ্বেষ উসকে দিয়েছে। কিন্তু এর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বললেই চলে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কমসংখ্যক নারী এবার প্রার্থী হন, নির্বাচিত হয়েছেন মাত্র সাতজন। নারীর অধিকার ও ক্ষমতায়নের পথে এটি বড় একটি ধাক্কা বলেই আমরা মনে করি।
নারী ও শিশু সুরক্ষার শুধু আইন থাকলেই হয় না, বাংলাদেশের মতো প্রবল পুরুষতান্ত্রিক সমাজে আইনের প্রয়োগই ন্যায়বিচারের পথে সবচেয়ে বড় বাধা। ২০১৯ সালে প্রথম আলোর দুটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বেরিয়ে আসে ভুক্তভোগী নারী ও শিশুদের বিচারিক প্রতিকার পাওয়া কতটা দুরূহ। মামলা দিতে গিয়ে অর্ধেকের বেশি নারী ও শিশু হেনস্তার শিকার হন। আর প্রায় ৯৭ শতাংশ মামলায় অপরাধীদের সাজা হয় না। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ও ক্ষমতাকাঠামোর গভীরে গেড়ে বসা বিচারহীনতার এই সংস্কৃতিই নারীকে অধস্তন করে রাখার প্রধান একটি রাজনীতি। নারীর অধিকার ও নিরাপত্তার মূলেই রয়েছে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং আইনি বৈষম্য দূর করার জরুরি প্রশ্ন।
বাংলাদেশের যে অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা ও উন্নয়ন, তার পেছনে নারীর অবদান পুরুষের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। এই অগ্রগতি ধরে রাখতে হলে ঘরে–বাইরে–ডিজিটাল পরিসরে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষা, চিকিৎসা, বিজ্ঞান, প্রশাসন, পুলিশ, সংস্কৃতি, খেলাধুলা, রাজনীতি, প্রযুক্তি, নতুন উদ্যোগ, ব্যবসা—সব জায়গায় নারীরা সমানতালেই ভূমিকা রেখে চলেছেন। আন্তর্জাতিক নারী দিবসে সব শ্রেণি–পেশার নারীর জন্য আমাদের আন্তরিক অভিনন্দন রইল।