প্রথম আলোর খবর জানাচ্ছে, সিদ্দিকুর রহমান, আবদুল জলিল মণ্ডল, জাহিদুল ইসলাম ও হাবিবুর রহমান—পাবনার ঈশ্বরদীর এই চার কৃষক নিজের চেষ্টায় সফল হয়েছিলেন, কৃষিতে অবদানের জন্য তাঁরা জাতীয় পদক পেয়েছিলেন। কিন্তু ব্যাংকের ঋণ নিয়ে এখন তাঁরা বিপাকে; চাষের জমি, বাগান ও খামার নিলামে উঠেছে। ঋণ পরিশোধ করতে না পারার মামলায় কেউ গ্রেপ্তারি পরোয়ানা নিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন, কারওবা মামলার হাজিরা দিতেই জীবন শেষ।

স্বশিক্ষিত কৃষক সিদ্দিকুর রহমান বিশেষ কৌশল প্রয়োগ করে কুলবাগানে ফুলের পরাগায়ন বাড়াতে সক্ষম হন। এতে ফলের উৎপাদন অনেক বেড়ে যায়। এই সফলতা তাঁকে ‘কুল-ময়েজ’ হিসেবে পরিচিতি এনে দেয়। কুল চাষে এই সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৪ সালে বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পুরস্কার পান। পুরস্কার পাওয়ার পর গরুর খামার করার জন্য ব্যাংক তাঁকে বড় অঙ্কের ঋণ দেয়। বাড়িতে গরু পুষলেও খামার ব্যবস্থাপনার পূর্ব অভিজ্ঞতা তাঁর ছিল না। এ ছাড়া ২০১২ থেকে ২০১৪—এই দুই বছর রাজনৈতিক অস্থিরতা, হরতাল ও অবরোধের কারণে গরুর দুধ তিনি ঠিকমতো বাজারজাত করতে পারেননি। ২০১৩ সালে ব্যাংক তাঁর বিরুদ্ধে ঋণখেলাপির মামলা করে। ঋণ পুনঃ তফসিলের আবেদন করলেও ব্যাংক তা গ্রহণ করেনি।

ঈশ্বরদীতে প্রথম দিকে যাঁরা বাণিজ্যিকভাবে লিচু চাষের প্রচলন করেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম আবদুল জলিল। লিচু চাষে সফলতা দেখিয়ে ২০০৯ সালে তিনি জাতীয় ফল পুরস্কার পান। এরপর একটি ব্যাংক তাঁকে ২০০ গরুর খামারের জন্য প্রকল্প ঋণ দেওয়ার উৎসাহ দেয়।

সে অনুযায়ী খামার করার পর শেষ পর্যন্ত ব্যাংক তাঁকে ১০০ গরুর খামারের জন্য ঋণ দেয়। সেটাও দেয় দেরি করে ও কিস্তিতে। ঋণ পুনঃ তফসিলে করা তাঁর আবেদনেও সাড়া দেয়নি ব্যাংক। যে লিচুবাগানের জন্য তিনি জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিলেন, সেটিই এখন নিলামে তোলার প্রক্রিয়া চলছে।

সিদ্দিকুর–জলিলসহ চার কৃষকই নিজেদের উদ্ভাবনী ক্ষমতা ও পরিশ্রমের ওপর ভর করে কৃষিতে অবদান রেখেছিলেন। পুরস্কার পাওয়ার পর ব্যাংকগুলো গরুর খামার করার জন্য বা যে কাজে তাঁদের অভিজ্ঞতা নেই, সেই কাজে তাঁদের বড় অঙ্কের ঋণ দিয়েছে।

এ ক্ষেত্রে উদ্যোক্তার সামর্থ্য আছে কি না, খাতটি সম্ভাবনাময় কি না, সেই বিবেচনা মোটেও করা হয়নি। এই অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্ত শুধু চার কৃষকের জীবনে চরম বিপর্যয় ডেকে আনেনি, তাঁদের অভিজ্ঞতা থেকে সমৃদ্ধ হওয়া থেকেও বঞ্চিত হয়েছেন অন্য কৃষকেরা। এর দায় কি ব্যাংকগুলো এড়াতে পারে?

খাদ্যনিরাপত্তার বিষয়টি কেন্দ্রে রেখে বাকি বিশ্বের সঙ্গে মিলিয়ে আমাদের কৃষি উন্নয়নের ধারা বদলের সময় এসেছে। শুধু ঋণ দিয়ে কৃষকের ভাগ্য পরিবর্তন সম্ভব নয়, এর বড় উদাহরণ পদকজয়ী কৃষকেরা। প্রশিক্ষণ, বিমা, বাজারসহ অন্যান্য সমস্যার সমাধান দিয়ে কৃষি ও কৃষকের উন্নয়নে সমন্বিত কৌশল প্রণয়ন করতে হবে।