২০০৯ সালের এপ্রিলে আওয়ামী লীগ সরকার ফৌজদারি কার্যবিধি সংশোধন করে। এই সংশোধনের ফলে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে কিছু ক্ষেত্রে বিচারিক ক্ষমতা প্রয়োগের সুযোগ পান। বিষয়টি নিয়ে একই বছরের নভেম্বরে হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করা হয়। আদালত এই মামলায় সুপ্রিম কোর্টের চারজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবীকে অ্যামিকাস কিউরি (আদালতের বন্ধু) নিয়োগ দেন।

ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টার–এ প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, ২০১৫ সালের এপ্রিলে অনুষ্ঠিত শুনানিতে দুই অ্যামিকাস কিউরি ড. কামাল হোসেন এবং আজমালুল হোসেন আদালতে তাঁদের মতামত দেন। তাঁরা দুজনই নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের বিচারিক কর্মকাণ্ড পরিচালনাকে আইনসংগত নয় বলে উল্লেখ করেন। এরপর এই মামলার আর কোনো শুনানি হয়নি। মামলাটি ঝুলে থাকায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা এখনো বিচারিক ক্ষমতা প্রয়োগ করে যাচ্ছেন। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের বিচারিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা একই সঙ্গে সংবিধান এবং বিচার বিভাগ পৃথক্‌করণ নিয়ে উচ্চ আদালতের দেওয়া রায়ের পরিপন্থী বলে মনে করেন কোনো কোনো আইনজ্ঞ।

রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অর্থাৎ অ্যাটর্নি জেনারেলকে উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, রিট আবেদন এবং এ–সংক্রান্ত হাইকোর্টের আদেশ সম্পর্কে কোনো কিছু জানেন না বলে তিনি বিষয়টি নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে পারবেন না। অন্যদিকে রিটকারীর আইনজীবী বিলম্বের কারণ হিসেবে সর্বশেষ শুনানির পর হাইকোর্টের ওই বেঞ্চ তিনবার পুনর্গঠন হওয়ার কথা জানান। তবে শুনানি ঝুলে থাকার জন্য এই কারণ কতটা যুক্তিযুক্ত, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

মাসদার হোসেন মামলায় দেওয়া ১২ দফা নির্দেশনা সরকার এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়ন করেনি; বরং নতুন নতুন আইন করে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। এ রকম অবস্থায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের বিচারিক কাজ পরিচালনা করা নিয়ে মামলার শুনানি ঝুলে থাকার ঘটনাটিকে কোনো ‘সরল’ বা ‘সাধারণ’ বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

রাষ্ট্রীয় নানা ক্ষেত্রে আমলাতন্ত্র তথা প্রশাসন ক্যাডারের প্রভাবের বিষয়টি আমাদের দেশে একটি আলোচিত বিষয়। সরকারও নানা কারণে আমলাতন্ত্রের ওপর অতিনির্ভরশীল।

এ রকম অবস্থায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের বিচারিক কাজ পরিচালনা করার বিরুদ্ধে আদালত কোনো সিদ্ধান্ত দিলে তা আমলাতন্ত্রকে ক্ষুব্ধ করতে পারে—এমন আশঙ্কা অমূলক নয়। তাই এই মামলা ঝুলে থাকাটা সরকার ও আমলাতন্ত্র উভয়ের জন্যই স্বস্তির বিষয়। এ কারণে শুনানি না হওয়াটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, নাকি ‘ইচ্ছাকৃতভাবে’ বিলম্ব করা হচ্ছে, তা নিয়ে সন্দেহ-সংশয়ের যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে।

নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের বিচারিক কাজ পরিচালনা করা নিয়ে মামলাটি বিচার বিভাগের স্বাধীনতার সঙ্গে সম্পর্কিত। এ কারণে দ্রুত এই মামলার শুনানি শুরু হওয়া জরুরি। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবে এবং সংবিধান ও মাসদার হোসেন মামলায় দেওয়া রায়ের আলোকে আদালতে বিষয়টি সুরাহা হবে—এটাই বিধেয়।

সম্পাদকীয় থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন