একটি দেশের ভবিষ্যতের ভিত্তি রচিত হয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে। কিন্তু ময়মনসিংহের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর যে চিত্র প্রথম আলোর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, তা খুবই হতাশাজনক। জরাজীর্ণ ভবন, মাথার ওপর খসে পড়া পলেস্তারা, সুপেয় পানির অভাব আর শৌচাগারহীন পরিবেশ—এই যদি হয় একটি অঞ্চলের প্রাথমিক শিক্ষার চালচিত্র, তা নিয়ে আমাদের শঙ্কিত হতেই হয়। বলতে হয়, অগ্রগামী বাংলাদেশ বা শিক্ষিত জাতি গড়ার স্বপ্নও এখানে থমকে থাকে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ময়মনসিংহের ২ হাজার ১৪০টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ১৬৭টির ভবনই জরাজীর্ণ। পরিত্যক্ত ভবনে প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে ক্লাস করছে খুদে শিক্ষার্থীরা। যে বয়সে শিশুদের মনের আনন্দে বিদ্যালয়ে আসার কথা, সেই বয়সে তাদের তাড়া করে ফেরে ছাদ ধসে পড়ার আতঙ্ক। এর ফল যা হওয়ার তা-ই হচ্ছে; গত ছয় বছরে জেলায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে প্রায় পৌনে তিন লাখ। আধুনিক যুগে এসেও ২৭টি বিদ্যালয় এখনো টিনশেড ঘরে চলছে, যা শিক্ষা খাতের অবকাঠামোগত দৈন্যেরই বহিঃপ্রকাশ।
শৌচাগার বা ওয়াশ ব্লক এবং সুপেয় পানি বিলাসিতা নয়, বরং অধিকার। কিন্তু ৫৩০টি বিদ্যালয়ে ওয়াশ ব্লক না থাকা এবং ১৮৯টি বিদ্যালয়ে নলকূপ না থাকা চরম স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে। বিশেষ করে ছাত্রীদের জন্য এটি বিদ্যালয়ে না আসার একটি বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিক্ষক–সংকটের চিত্রটিও ভয়াবহ; ৭৭৬টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নেই। অভিভাবকহীন একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কীভাবে গুণগত মান নিশ্চিত করবে?
বিদ্যালয়ের ১০ একর জমি প্রভাবশালী মহলের দখলে থাকা প্রশাসনের চরম ব্যর্থতা। যেখানে নতুন ভবনের জন্য জায়গার অভাব হয়, সেখানে ১০ একর জমি বেদখল থাকা মেনে নেওয়া যায় না। জেলা প্রশাসনকে জমি উদ্ধারে তালিকা পাঠানো হলেও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই কেন, তার জবাবদিহি থাকা প্রয়োজন।
মামলা বা আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কাটিয়ে দ্রুত প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে। পরিত্যক্ত ভবনগুলো অনতিবিলম্বে ভেঙে নতুন ভবন নির্মাণ করতে হবে। বরাদ্দ আসার অপেক্ষায় ক্লাস বন্ধ রাখা বা ঝুঁকিতে রাখা চলবে না। প্রতিটি বিদ্যালয়ে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ওয়াশ ব্লক নির্মাণ ও সুপেয় পানির ব্যবস্থা করতে হবে। ভবন সংস্কার বা নতুন নির্মাণের জন্য প্রকল্প গৃহীত হলে পরিকল্পনা, বরাদ্দ, ঠিকাদার নিয়োগ ও বাস্তবায়ন নিয়ে শুরু থেকেই স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।
শৈশব যদি ঝুঁকিপূর্ণ আর আনন্দহীন হয়, তবে সমৃদ্ধ জাতি গঠন অসম্ভব। আমরা আশা করি, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় প্রশাসন ময়মনসিংহের এই ‘কঙ্কালসার’ প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থাকে টেনে তুলতে দ্রুত এবং কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।