গণতান্ত্রিক যাত্রায় অশনিসংকেত

চব্বিশের রক্তক্ষয়ী গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের মানুষ যখন এক ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ার স্বপ্ন দেখেছিল, তখন সবার অবচেতনেই একটি বড় প্রত্যাশা ছিল—অন্তত মানবাধিকার ও আইনের শাসনের ক্ষেত্রে দেশ এক আমূল পরিবর্তনের দেখা পাবে। কিন্তু ২০২৫ সাল শেষে দেশের শীর্ষস্থানীয় তিনটি মানবাধিকার সংগঠনের (আসক, এমএসএফ এবং এইচআরএসএস) বার্ষিক প্রতিবেদন যে করুণ চিত্র তুলে ধরেছে, তা হতাশাজনক। 

তিনটি সংস্থার প্রতিবেদনে এটি স্পষ্ট, স্বৈরাচারী সরকারের পতন ঘটলেও বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের অকার্যকারিতা এখনো ভয়াবহ রূপ ধারণ করে আছে। ২০২৫ সালের মানবাধিকার পরিস্থিতির সবচেয়ে কলঙ্কজনক অধ্যায় হলো ‘মব সন্ত্রাস’ ও গণপিটুনি। আসক-এর তথ্যমতে, বছরজুড়ে ১৯৭ জন মানুষ গণপিটুনিতে প্রাণ হারিয়েছেন, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। রংপুরের তারাগঞ্জে ভ্যানচোর সন্দেহে প্রদীপ লাল ও রূপলাল দাসের নির্মম হত্যাকাণ্ড আমাদের সমাজের অসহিষ্ণুতা ও পৈশাচিকতাকে নগ্নভাবে প্রকাশ করেছে। হাতজোড় করে বাঁচার আকুতি জানানো সত্ত্বেও যখন পুলিশি নিষ্ক্রিয়তার মুখে মানুষকে পিটিয়ে মারা হয়, তখন বুঝতে হবে রাষ্ট্রের ওপর নাগরিকের ন্যূনতম আস্থাও অবশিষ্ট নেই। তৌহিদি জনতার নামে মাজার ভাঙচুর, বাউলদের ওপর হামলা কিংবা মব তৈরি করে শিল্প-সংস্কৃতি কেন্দ্র গুঁড়িয়ে দেওয়া কোনোভাবেই বৈষম্যহীন রাষ্ট্রের লক্ষণ হতে পারে না।

সংগঠনগুলোর তথ্যমতে, কারাগারে ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে মৃত্যুর সংখ্যাও উদ্বেগজনক। ১০৭ থেকে ১১৬ জনের কারান্তরালে মৃত্যু বড় ধরনের প্রশ্নই তৈরি করে। কমপক্ষে ৩৮ জন বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছেন। এসব ঘটনা সংঘটিত হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে, নির্যাতনে, কথিত ‘গুলিতে’ বা ‘বন্দুকযুদ্ধের’ নামে। এসব মৃত্যু আইনের শাসন নিশ্চিত করার অঙ্গীকারকে উপহাসে পরিণত করে। 

এমএসএফের প্রতিবেদন বছরজুড়ে ৬৪১টি অজ্ঞাতনামা লাশ উদ্ধারের ঘটনা জানিয়েছে। এত পুলিশি টহল ও নজরদারির মধ্যেও কীভাবে শত শত মানুষের হাত-পা বাঁধা বা বস্তাবন্দী লাশ উদ্ধার হয়, তার কোনো সদুত্তর প্রশাসনের কাছে নেই। এর পাশাপাশি রাজনৈতিক সহিংসতায় শতাধিক মৃত্যু এবং বিশেষ করে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ৩৯ জনের প্রাণহানি প্রমাণ করে যে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও সহনশীলতার প্রচণ্ড অভাব রয়েছে।

আসক ও এমএসএফের তথ্যমতে, ৪০০ থেকে ৬০০ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। ১৮ ডিসেম্বর প্রথম আলো ডেইলি স্টার ভবনে যে নজিরবিহীন হামলা ও অগ্নিসংযোগ চালানো হলো, তা স্বাধীন সাংবাদিকতার কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেওয়ার নামান্তর। কোনো কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ঢালাও হত্যা মামলা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে সংকটে ফেলেছে। 

আমরা মনে করি, গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে নানা বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে, কিন্তু তা দেড় বছর ধরে চলতে পারে না। মব সন্ত্রাস বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের প্রতিটি ঘটনা আসলে সরকারের ব্যর্থতারই প্রতিফলন। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কেবল ‘পুরোনো আমলের অজুহাত’ দিলে চলবে না। যদি প্রকৃত অপরাধীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনা না হয় এবং পুলিশি নিষ্ক্রিয়তা দূর না হয়, তবে এই নৈরাজ্য পুরো রাষ্ট্রকেই গ্রাস করবে।

অন্তর্বর্তী সরকারের উচিত মানবাধিকারকর্মীদের এই সতর্কবার্তাকে গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া। মব সন্ত্রাসীদের রাজনৈতিক পরিচয়–নির্বিশেষে গ্রেপ্তার করতে হবে এবং রাষ্ট্রীয় হেফাজতে প্রতিটি মৃত্যুর স্বচ্ছ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। মনে রাখতে হবে, মানুষের জীবনের নিরাপত্তা দিতে না পারলে কোনো সংস্কার বা গণ-অভ্যুত্থান টেকসই হবে না। নির্বাচন সামনে রেখে মানবাধিকার পরিস্থিতি উন্নত করার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আরও বেশি সচেষ্ট হতে হবে সরকারকে। সেই সঙ্গে সব রাজনৈতিক পক্ষের উচিত গণতান্ত্রিক যাত্রায় এই অশনিসংকেতকে গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া।