সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা যখন ধারাবাহিকভাবে কমছে, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগে যখন ভাটা চলছে, তখন সব ধরনের জ্বালানি তেলের মূল্য লিটারে একলাফে ২০ টাকা বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত গোটা অর্থনীতির ওপরই অভিঘাত সৃষ্টি করবে। কৌশলগত পণ্য জ্বালানি তেলের এই মূল্যবৃদ্ধির চাপ শুধু পরিবহন খাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; খাদ্য, কৃষি, শিল্প ও সেবা—সব খাতেই ব্যয় বাড়বে। সাড়ে চার বছর ধরে ক্রমাগত প্রকৃত আয় খোয়াতে থাকা সাধারণ মানুষের ওপর নতুন মূল্যস্ফীতির বোঝা চাপবে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হচ্ছে, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির ফলে অর্থনৈতিক অভিঘাত ও মূল্যস্ফীতির নতুন চাপ সামাল দেওয়ার কৌশল কী, তা নিয়ে সরকারের অবস্থান পরিষ্কার নয়।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ও সংঘাতময় পরিস্থিতি বৈশ্বিক জ্বালানিবাজারকে যেভাবে অনিশ্চিত ও ঊর্ধ্বমুখী করে তুলেছে, তার মাশুল গোটা বিশ্বকেই দিতে হচ্ছে। আমদানিনির্ভর দেশ হিসেবে বাংলাদেশের ওপর এর প্রভাব স্বাভাবিকভাবেই বেশি। যুদ্ধ শুরুর পর গত এপ্রিলে জ্বালানির দাম এক দফা বাড়ানো হয়েছিল। ফলে বর্তমান সরকারের আমলে দুই দফায় সব ধরনের জ্বালানির দাম লিটারে ৩৫ থেকে ৪৫ টাকা বাড়ল। জ্বালানি বিভাগের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ও পণ্য পরিবহন ব্যয় বাড়ার কারণে বিপিসিকে প্রতিদিন বিপুল অঙ্কের টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে। এ ছাড়া পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম কম হওয়ায় পাচারের শঙ্কার বিষয়টিও বলা হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি ও পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির বাস্তবতাকে স্বীকার করে নিয়েই প্রশ্ন করতে হবে যে অর্থনীতির এই নাজুক সময়ে একলাফে লিটারে ২০ টাকা বাড়ানোর বিকল্প পথ কি ছিল না? সরকারি হিসাব বলছে, মূল্যবৃদ্ধির ফলে বিপিসির লোকসান কমতে পারে ১০ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু এর ফলে জিনিসপত্র ও সেবার দাম বেড়ে উৎপাদন ও বাণিজ্যে আরও স্থবিরতা এবং এর পরিণতিতে বিপুলসংখ্যক মানুষের ক্রয়ক্ষমতা নিশ্চিতভাবেই কমে যাবে। সে ক্ষেত্রে যতটুকু ভর্তুকি কমবে, তার চেয়ে বেশি রাজস্ব হারাতে হতে পারে। সবচেয়ে বড় বিষয়, সরকার ভর্তুকির কথা বললেও জ্বালানি তেলের ওপর উচ্চ হারে ভ্যাট-ট্যাক্স আরোপ করা আছে। ফলে এই সংকটকালে কর কমিয়ে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করার সুযোগ ছিল।
সরকারকে মনে রাখা প্রয়োজন যে চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০২২ সালের আগস্ট মাসে জ্বালানি তেলের দাম একলাফে সবচেয়ে বেশি বাড়ানো হয়েছিল। এর অভিঘাতে মূল্যস্ফীতি এক মাসের মধ্যে ২ শতাংশ বেড়ে গিয়েছিল এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির সেই জোয়াল থেকে এখন পর্যন্ত দেশকে বের করে আনা সম্ভব হয়নি। ফলে বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রকৃত আয় অনেকটাই কমে গেছে।
আরেকটি উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, বৈশ্বিক ও দেশীয় অর্থনীতির এই নাজুক বাস্তবতা উপেক্ষা করে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা ১০০-১৪২ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। এটা সত্যি যে মূল্যস্ফীতির বিবেচনায় সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা বাড়ানোটা প্রয়োজনীয় ছিল। কিন্তু একলাফে এতটা বৃদ্ধির কারণে যে বিপুল অঙ্কের অর্থের প্রয়োজন, তার সংস্থান কীভাবে হবে, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অর্থের সংস্থান করতে গিয়ে জনগণের কাঁধে নতুন করে করের বোঝা চাপানো কিংবা জ্বালানি-সারে ভর্তুকি কমানো কিংবা দেশি-বিদেশি উৎস থেকে ঋণ নেওয়া কোনো অর্থেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। সরকারকে মনে রাখা প্রয়োজন যে মূল্যস্ফীতি শুধু দেশের ১৪-১৫ লাখ সরকারি চাকরিজীবীর সংকট নয়; এর সবচেয়ে বেশি আঁচ গিয়ে পড়ছে নিম্ন ও সীমিত আয়ের মানুষের ওপর। তাঁদের সুরক্ষায় সরকারের উদ্যোগ কোথায়?